শেখ হাসিনার মামলায় তৃতীয় দিনের যুক্তিতর্ক শেষ

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামীকাল বুধবার (১৫ অক্টোবর) দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। 

তৃতীয় দিনের মতো আজ দিনভর রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এদিন জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন তথ্যচিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি শেখ হাসিনার সঙ্গে হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলে নূর তাপসের কথোপকথনসহ কয়েকটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়। একইসঙ্গে এ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষীর বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়। 

গতকাল সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক বা আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করা হয়। ওই দিন বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। যা এ মামলার বিচারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ১২ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। ওই দিন বেলা পৌনে ১২টা থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপন। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের ইতিহাস তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর। একইসঙ্গে গুম-খুনসহ নারকীয় সব ঘটনার বর্ণনা দেন। আর এসব বিবরণ এ মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন তাজুল ইসলাম।

গত ৮ অক্টোবর মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরকে তৃতীয় দিনের মতো জেরা শেষ করেন শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এরপর যুক্তিতর্কের জন্য দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল।

সবমিলিয়ে মোট ২৮ কার্যদিবসে এ মামলায় ৫৪ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ৭ অক্টোবর দ্বিতীয় দিনের মতো জেরা শেষ করেন আমির হোসেন। ৬ অক্টোবর এ জেরা শুরু হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর। তিনি এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ৫৪তম বা সর্বশেষ সাক্ষী। জবানবন্দিতে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে গত বছরের জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ৪১টি জেলার ৪৩৮টি স্থানে হত্যাকাণ্ড ও ৫০টিরও বেশি জেলায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

২৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দি দেন এই তদন্ত কর্মকর্তা। সেদিনও বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি নিজের জব্দ করা জুলাই আন্দোলনের নৃশংসতা নিয়ে দেশের একটি গণমাধ্যমকে একটি প্রতিবেদন প্রদর্শন করা হয় ট্রাইব্যুনালে। এছাড়া গত বছরের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। এমনকি জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ওপর তিন লাখ পাঁচ হাজার গুলি ছোড়া হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তিনি। ২৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীরের জবানবন্দি শুরু হয়। ওই দিন তার জব্দকৃত ১৭টি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শিত হয়। এসব ভিডিওতে জুলাই-আগস্টের নির্মমতা ফুটে ওঠে। ২৪ সেপ্টেম্বর এ মামলার ২২তম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়। ওই দিন সাক্ষ্য দেন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। পরে তাকে জেরা করেন আমির হোসেন।

মামলার অন্যতম আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও ৩৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। নিজের দায় স্বীকার করে আগেই হয়েছেন রাজসাক্ষী। এছাড়া সাক্ষীদের জবানবন্দিতে গত বছরের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানোর বীভৎস বর্ণনা উঠে এসেছে। আর এসবের জন্য দায়ী করে শেখ হাসিনা, কামালসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন শহীদ পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার ও শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। সাক্ষী করা হয়েছে ৮১ জনকে। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

ইউটি/টিকে


Share this news on:

সর্বশেষ

img
‘অবস্থান থেকে এক ইঞ্চি নড়ব না, ভারতেও যাব না’ Jan 13, 2026
img
বগুড়ায় এনসিপি নেতাকে অব্যাহতি Jan 13, 2026
img
তারকা সন্তান মানেই বখে যাওয়া নয়, জানালেন জয়া বচ্চন Jan 13, 2026
img
জীবনের অন্ধকার অধ্যায় থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসেন অভিনেত্রী রাশমি দেশাই? Jan 13, 2026
img
ছেলেকে পাশে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সুনীল Jan 13, 2026
img
বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য পাকিস্তানের এমন উদারতার প্রয়োজন নেই: সংগীতশিল্পী হামিন Jan 13, 2026
img
শাশ্বতী-ভাস্বর পর্দায় মা-ছেলে, বাস্তবে কী সম্পর্ক জানেন? Jan 13, 2026
img
ভোটে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা Jan 13, 2026
img
শহিদ কাপুরের ‘ও রোমিও’-র বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ, আড়াই কোটি ক্ষতিপূরণ দাবি Jan 13, 2026
img
জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারেক রহমান শীর্ষে রয়েছেন: মোনায়েম মুন্না Jan 13, 2026
img
গোল্ডেন গ্লোবসে নিক-প্রিয়াঙ্কার রোমান্টিক ছবি, কী বলছেন ভক্ত ও সহকর্মীরা? Jan 13, 2026
img
ইরানের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন গোপন ও সামরিক বিকল্প বিষয়ে অবহিত ট্রাম্প Jan 13, 2026
img
অবশেষে সত্য হতে যাচ্ছে গুঞ্জন, কাল বিয়ে করছেন জেফার-রাফসান! Jan 13, 2026
img
সিলেটের হয়ে বিপিএল মাতাবেন ইংলিশ অলরাউন্ডার Jan 13, 2026
img
ইরানের বিক্ষোভকে সমর্থন করে মালালার বার্তা Jan 13, 2026
img
দুই-একটা বিশ্বকাপ না খেললে কিছু যায় আসে না, আসিফের এমন মন্তব্যে কী বললেন সুজন Jan 13, 2026
img
বিএনপি ও যুবদল নেতার বিরুদ্ধে ‘মানহানিকর বক্তব্যের’ অভিযোগ রুমিন ফারহানার Jan 13, 2026
img
খালেদা জিয়া ছিলেন জনগণের নেত্রী : খন্দকার আবু আশফাক Jan 13, 2026
img
স্কাইডাইভিংয়ে সর্বাধিক পতাকা উড়িয়ে গিনেস রেকর্ড বাংলাদেশের Jan 13, 2026
img
বিশালের ‘ও রোমিয়ো’ ছবিতে গালিগালাজের কোন ব্যাখ্যা দিলেন ফরিদা? Jan 13, 2026