নরসিংদীতে বারবার ভূমিকম্পের কারণ ব্যাখ্যা করলেন বিশেষজ্ঞরা

রাজধানী ঢাকার কাছে নরসিংদীর মাধবদীতে গত শুক্রবার যে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিলো তাতে কেঁপে ওঠেছিলো রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ এবং ভূমিকম্পের জেরে এখন পর্যন্ত মারা গেছে অন্তত দশ জন, আর আহত হয়েছে পাঁচশোর বেশি মানুষ।

ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে নরসিংদীর জেলার মাধবদী উপজেলায় মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের শক্তি জমছে বলে জানিয়েছে দেশি বিদেশি সংস্থা ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ইউএসজিএস-এর মতে, বাংলাদেশের ৭ কোটির মতো মানুষ মৃদু বা হালকা ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন।

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ভূমিকম্পটিকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প হিসেবে বর্ণনা করেছে বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগও। এরপর আজ শনিবার আবারও মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিলো ৩ দশমিক ৩, যার উৎপত্তিস্থল নরসিংদী জেলারই পলাশ উপজেলা।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, মাধবদীর যেই ভূমিকম্প সারা দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় যে তীব্র আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে তার কারণ কী? কিংবা ঢাকা শহরে ব্যাপক ঝাঁকুনি দেওয়া এই ভূমিকম্প সম্পর্কে আর কী জানা যাচ্ছে?

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছেন, মাধবদী ভূমিকম্পের কারণ ভূগর্ভে ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের অবস্থান পরিবর্তন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূতাত্ত্বিক চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ কয়েকটি টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত, যেগুলো ভূগর্ভে তরল পদার্থের ওপর ভাসছে এবং এই প্লেটগুলো গতিশীল- একে অপরের সাপেক্ষে অবস্থান পাল্টাচ্ছে।

তবে এর বাইরে অনেক জায়গায় সাব-প্লেট ক্রিয়াশীল আছে। যেসব স্থানে একটি প্লেট এসে আরেকটি প্লেটের কাছাকাছি মিশেছে বা ধাক্কা দিচ্ছে বা ফাটলের তৈরি হয়েছে, সেটাকে বলা হয় ফল্ট লাইন। বাংলাদেশে এমন কয়েকটি ফল্ট লাইন আছে।

এই প্লেটগুলো যখন সরে যায় বা নড়াচড়া করতে থাকে কিংবা একটি অন্যদিকে ধাক্কা দিতে থাকে, তখন এক ধরনের শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে।

আর সেই শক্তি যখন সেখানকার শিলার ধারণ ক্ষমতার পেরিয়ে যায়, তখন আগে থেকে থাকা কিংবা নতুন তৈরি হওয়া ফাটল কিংবা শিলা ব্লক একটি আরেকটির উপরে উঠে গেলে সেখানে সঞ্চিত শক্তি বেরিয়ে আসলেই ভূ-পৃষ্ঠে কম্পন অনুভূত হয়। মূলত এটিই ভূমিকম্প।

ইউএসজিএস এর মতে, শুক্রবার বাংলাদেশের যেখানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে যে অঞ্চলে সেখানে ১৯৫০ সালের পর থেকে শুক্রবারের ভূমিকম্পের আগে ৫ দশমিক ৫ মাত্রা বা এর চেয়ে বড় আকারের ভূমিকম্প হয়েছে ১৪টি।

বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটো। এর একটি হলো 'ডাউকি ফল্ট', যা ভারতের শিলং মালভূমির পাদদেশে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ-জামালগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে বিস্তৃত যা প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। আরেকটি হলো: সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, টেকনাফ পর্যন্ত যা সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উৎসটিকে খুব ভয়ংকর বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

টেকটনিক প্লেটে বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে- পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট আর পূর্ব দিকে বার্মা প্লেট। আর বাংলাদেশের উত্তরদিকে আছে ইউরেশিয়ান প্লেট।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছেন, ভারতীয় প্লেটটি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বার্মা প্লেটের নিচে অর্থাৎ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। তলিয়ে যাওয়ার কারণে একটা সাবডাকশান জোনের তৈরি হয়েছে। আর নটরিয়াস (ভয়ংকর অর্থে) এই জোনের ব্যাপ্তি সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল এর মধ্যে পড়েছে। এখানে বিভিন্ন সেগমেন্ট আছে। আমাদের এই সেগমেন্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে। এটা বের হতেই হবে।

তার মতে, নরসিংদীর মাধবদীতে যে ভূমিকম্পের উৎস ছিলো সেই এই সেগমেন্টেরই এবং নরসিংদীতে দুই প্লেটের যেখানে সংযোগস্থল, সেখানেই ভূমিকম্প হয়েছে।

মাধবদীর ভূমিকম্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে প্লেট লকড হয়ে ছিলো। এর অতি সামান্য ক্ষুদ্রাংশ খুললো বলেই শুক্রবারের ভূমিকম্প হয়েছে।

এটিই ধারণা দেয় যে সামনে বড় ভূমিকম্প আমাদের দ্বারপ্রান্তে আছে। এই যে বড় একটি প্লেট বাউন্ডারির খুব ক্ষুদ্র শক্তি খুলে গেলো তার মানে হলো সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ একটু খুলে যাওয়া কিছু শক্তি বের হওয়ায় সামনে এই শক্তির বের হওয়া আরও সহজ হয়ে গেছে।

তবে শুক্রবার মাধবদী ভূমিকম্পের পর আজ একই জেলার পলাশ উপজেলায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মাত্রা রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৩ বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই প্লেটের সংযোগস্থলে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে ৮০০ বছরের বেশি সময় ধরে। সেখানে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার ভূকম্পন তৈরির মতো শক্তি জমা হয়ে আছে বলে বলছেন সৈয়দ হুমায়ুন আখতার।

তিনি বলেন, এটা বের হবেই। মাধবদীর ভূমিকম্পের কারণে এখন সামনে সহজেই সেই শক্তি বের হয়ে আসতে পারে। আর সেটি হলে আমাদের ঢাকা নগরীর একটি মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। সে কারণে আর অবহেলা না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের এই অঞ্চলে আগেও বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, এমনকি ভূমিকম্পে নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে সেগুলো ছিল সিলেট ও চট্টগ্রাম এই দুটো উৎসের বাইরে।

এ ধরনের ভূমিকম্পে ১৭৯৭ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বদলে গেছে। এখনকার মেঘনা নদী এক সময় লালমাই পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে এই নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়ে ২০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে বর্তমান অবস্থানে সরে আসে। ১৭৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে আসে। সিলেটের মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ এই অঞ্চলে ১৯২২ সালে হয়েছিল ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প। এর আগে ১৮৬৮ সালে ওই অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

ডাউকি ফল্ট যে অঞ্চলে সেই জৈন্তাপুর-সুনামগঞ্জে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৮৯৭ সালে। তবে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে এমন দুটিই অঞ্চলের যেখানেই বড় কোনো ভূমিকম্প হলে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ঢাকাতেই বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইকে/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
বাংলাদেশকে ২৭০ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে জার্মানি Jan 08, 2026
কতজন পেলেন পোস্টাল ব্যালট? Jan 08, 2026
img
নোয়াখালীর পর্যটন কেন্দ্র দখল চেষ্টার ঘটনায় আটক ২ Jan 08, 2026
বিশ্বকাপ ভেন্যু সরে গেলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক : অশ্বিন Jan 08, 2026
শাকিব-হানিয়ার সিনেমা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু Jan 08, 2026
img
স্টাইলিশ নায়ক জাফর ইকবালের চলে যাওয়ার আজ ৩৩ বছর Jan 08, 2026
img
সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে বর্তমান প্রশাসন শতভাগ সফল হবে : মন্ত্রিপরিষদ সচিব Jan 08, 2026
img
৭ দিনে এলো ১১ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স Jan 08, 2026
img
অভিনেতা অভিমন্যু সিংয়ের বাড়ি থেকে গায়েব কোটি টাকার গয়না! Jan 08, 2026
img
'জুলাই বার্তাবীর' অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশ টাইমসের সাবেক মোবাইল জার্নালিস্ট ইমরান Jan 08, 2026
img
বেপরোয়া ট্রাম্পের লাগাম টানতে মার্কিন সিনেটে ভোটাভুটি Jan 08, 2026
img
জকসু নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়েছে : ভিপি প্রার্থী রাকিব Jan 08, 2026
img
অসুস্থ দেবলীনাকে দেখতে হাসপাতালে মদন মিত্র Jan 08, 2026
img
রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন Jan 08, 2026
img
‘নিজের রক্তের সঙ্গেও লড়ব!’ ফয়জল খানের অভিযোগে মুখ খুললেন আমির খান Jan 08, 2026
img
‎রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করল ডিএমপি Jan 08, 2026
img

খুলনা-১ আসন

২০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক কৃষ্ণ নন্দী, বছরে আয় ৬ লাখ Jan 08, 2026
img
ট্রাম্পের নির্দেশে ভারত নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সৌর জোট থেকে বেরিয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র Jan 08, 2026
img
ভারতের সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকার শীর্ষে ‘ধুরন্ধর’ Jan 08, 2026
img
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসবেন ইইউয়ের ২০০ প্রতিনিধি Jan 08, 2026