এনইআইআর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিকদের সিম এবং অনিবন্ধিত ডিভাইস কেন্দ্রিক অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা এবং জালিয়াতি থেকে মুক্তির পথ তৈরি হলো বলে মন্তব্য করেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
রোববার (৪ ডিসেম্বর) সকালে অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবন পরিদর্শনকালে এসব কথা বলেন তিনি। পরিদর্শনকালে তিনি হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সার্বিক অবস্থা ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এ হামলাটা সেদিনই ঘটলো যেদিন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একক খাত হিসেবে বৈধ মোবাইল আমদানিতে সর্বোচ্চ শুল্ক কমানো হয়েছে। অথচ প্রায় ষাট শতাংশ আমদানি শুল্ক কমানো কে স্বাগত না জানিয়ে রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ফয়েজ আহমদ তৈয়ব বলেন, পহেলা জানুয়ারি ২০২৬ এর আগে যে সকল ফোন বাংলাদেশে এসেছে সেগুলো সচল হোক বা অবিক্রিত থাকুক সবগুলো ফোনই আমরা বৈধ করে নিব। সাতটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের অবিক্রিত ফোনের আইএমইআই এর তালিকা প্রদান করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান দেয়নি তাদেরকে হয়তো ভুল বোঝানো হচ্ছে অথবা তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে সবাই এনইআইআর বাস্তবায়নে শরিক হবে বলে আমরা আশা করছি।
গ্রাহক স্বার্থে National Equipment Identity Register (NEIR) সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যাবলী দেওয়া হলো:
মোবাইল হ্যান্ডসেটের অবৈধ আমদানি ও ব্যবহার, হ্যান্ডসেট চুরি ও অবৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে সংগঠিত বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ এবং সরকারের রাজস্ব নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিটিআরসি কর্তৃক সকল কার্যকারিতাসহ গত ০১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে National Equipment Identification Register (NEIR) সিস্টেম চালু হয়। সিস্টেমটি চালু পরবর্তীতে মোবাইল হ্যান্ডসেটের রিটেইল ব্যবসায়ীদের মাঝে অসন্তোষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, NEIR সিস্টেম চালুর প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি অফ বাংলাদেশ এর প্রতিনিধিদের সাথে বিটিআরসির কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত আলোচনা সভাসমূহে ব্যবসায়িক কমিউনিটির পক্ষ থেকে নিম্নবর্ণিত দাবি-দাওয়া সমূহ উথাপিত হয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি কর্তৃক নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে:
দাবি-০১ : মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট আমদানির শুল্কহার হ্রাস করতে হবে।
গৃহীত পদক্ষেপ: বিগত ০১ বছরের অধিক সময়ে বেশ কয়েকবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসির পক্ষ থেকে মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানি শুল্ক হ্রাসকরণের জন্য এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে জানানো হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে মোবাইল হ্যান্ডসেটের শুল্ক সরকার কর্তৃক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো হয়েছে। পূর্বে আমদানির ক্ষেত্রে প্রায় ৬১% শুল্ক ছিল, বর্তমানে তা কমিয়ে প্রায় ৪৩% করা হয়েছে।
দাবি-০২ : মোবাইল ফোন আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
গৃহীত পদক্ষেপ : এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিটিআরসি থেকে জানানো হয়েছে যে, মোবাইল ফোন আমদানির জন্য বর্তমানে যে প্রক্রিয়া রয়েছে এবং কাগজপত্র দাখিল করতে হয় তা শিথিল করা হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে ভেন্ডর এনলিষ্টমেন্ট সনদ প্রদান করা হবে। মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির জন্য মোবাইল ফোনের অরিজিনাল উৎপাদনকারীর সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে যেকোনো অথরাইজড ডিলারের ডকুমেন্টস দাখিল সাপেক্ষে হ্যান্ডসেট আমদানি করা যাবে। গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা অর্থাৎ হ্যান্ডসেটের বিক্রয় পরবর্তী সেবা প্রাপ্তির লক্ষ্যে ন্যূনতম এই সার্টিফিকেট দাখিল করা প্রয়োজন।
দাবি-০৩: বর্তমানে অবিক্রিত/স্থিত হ্যান্ডসেটসমূহকে নেটওয়ার্কে আত্তীকরণ রাখতে হবে।
গৃহীত পদক্ষেপ: এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে যে, নামমাত্র শুল্ক প্রদান করে কোন কাগজ ব্যতিরেকে অবিক্রিত/স্থিত হ্যান্ডসেটের IMEI নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হবে। এমনকি যে সকল হ্যান্ডসেটের আমদানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেগুলো নেটওয়ার্কে আত্তীকরণ করা হবে।
দাবি-০৪: পুরনো মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানির করতে দিতে হবে।
বিটিআরসির জবাব : পুরনো হ্যান্ডসেট আমদানি অনুমোদনের বিষয়টি বিটিআরসির আওতাভুক্ত নয়। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন । বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পুরনো পণ্য আমদানির তালিকাতে মোবাইল হ্যান্ডসেটের নাম উল্লেখ নেই। মোবাইল হ্যান্ডসেটের মানের ওপর সেবার গুণগত মান নির্ভরশীল, তাই হ্যান্ডসেট ব্যবহারের মাধ্যমে কাঙ্খিতমানের সেবা প্রাপ্তির জন্য হ্যান্ডসেটের গুণাগুণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো হ্যান্ডসেটসমূহ কি পর্যায়ে রয়েছে বা কোন কোয়ালিটিতে আমদানি হচ্ছে তা যাচাই করা সম্ভব হয়না। তাই পুরনো যেকোনো হ্যান্ডসেট ক্রয়ে গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার আশংকা থাকে।
NEIR চালুর পর বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া এবং পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত নিম্নোলিখিত বেশ কয়েকটি বিষয় বিটিআরসির নজরে এসেছে। এ বিষয়ে বিটিআরসির বক্তব্য নিম্নরূপঃ
১। একজন গ্রাহক তাদের অনুকূলে অনেক অবৈধ/ Unstructured(অসংগঠিত) IMEI নাম্বার দেখতে পাচ্ছেন।
জবাব: বিষয়টি ক্লোন/কপি/ব্যবহৃত (used)/রিফারবিসড মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহারের ফলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই ধরনের IMEI যেন ভবিষ্যতে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে না পারে তা NEIR সিস্টেম চালুকরণের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য।
২। এছাড়া, একই NID'তে অধিক সংখ্যক সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা পরিলক্ষিত হওয়া।
জবাব: NEIR সিস্টেমে একজন গ্রাহকের এ যাবত কালের সকল Historic ডেটা সংরক্ষিত আছে, তাই এ ধরনের সংখ্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এই নিয়ে কাজ করছে যেন একজন গ্রাহক শুধুমাত্র বর্তমানে সচল হ্যান্ডসেটের তথ্য দেখতে পারেন। আশা করা যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে এ ধরনের সমস্যা সমূহ কমে আসবে।
৩। NEIR চালুর পর সিটিজেন পোর্টালে রেজিস্ট্রেশনের সময় মোবাইল অপারেটর থেকে One Time Password (OTP) আসতে কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব হচ্ছে।
জবাব: স্বল্প সময়ে অনেক Registration Request আসার ফলে কিছু গ্রাহক এই বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা মোবাইল অপারেটরদের EIR ব্যবস্থাপনার অংশ। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে বিটিআরসি থেকে সংশ্লিষ্ট সকল মোবাইল অপারেটরকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
৪। অনেক গ্রাহক তাদের তথ্যের নিরাপত্তা অর্থাৎ তথ্য চুরির বিষয়ে আশংকা প্রকাশ করছেন।
জবাব: এক্ষেত্রে, বিটিআরসির পক্ষ থেকে সকলকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, সকল গ্রাহকের সকল তথ্য সিকিউরড তথা নিরাপদ রয়েছে। একজন গ্রাহক কেবল তার নিজস্ব তথ্য দেখতে পারবেন, অন্য কেউ দেখতে পারবেন না।
সর্বোপরি, NEIR চালুর পরবর্তী সময়ে অধিক গ্রাহকের জিজ্ঞাসা (Call/Query) একই সাথে আসার ফলে গ্রাহকগণ যে সকল বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তা অতি দ্রুতই সমাধান হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এছাড়া, গ্রাহকের যে কোন সমস্যা বা জিজ্ঞাসা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার অথবা বিটিআরসির হটলাইন নাম্বার “১০০” তে জানানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ে সমস্যা সমাধান করা হবে।
পরিদর্শনকালে আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, এনডিসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান, বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোঃ এমদাদ উল বারী, ওএসপি, এনডিসি, পিএসসি, টিই (অবঃ)সহ বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এসএন