ব্যাপক বিক্ষোভে কার্যত অচল ইরানের বিক্ষুব্ধ জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি। সেই সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের পাশে থাকার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ভিডিওবার্তা পোস্ট করেন ক্রাউন প্রিন্স পাহলভি। সেই বার্তায় ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আমার প্রিয় দেশবাসী, গত এক সপ্তাহ ধরে আমি আপনাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি, বিশেষ করে তেহরানের বাজারগুলোতে আপনারা যেসব কর্মসূচি পালন করেছেন, সেগুলো। বর্তমান সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়ন সত্ত্বেও যেভাবে আপনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যে কোনো দেশের সরকার যতই শক্তিশালী হোক না কেন- জনগণ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুললে এক পর্যায়ে সরকারের সমর্থকরাও তাতে যোগ দেয় এবং সরকার তারা ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।”
“এ কারণে আপনাদের আন্দোলন-বিক্ষোভ কর্মসূচিকে একটি লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে হলে একে সুশৃঙ্খল রাখা জরুরি।”
“আজ আমি প্রথমবারের মতো আপনাদের একটি আহ্বান জানাচ্ছি। আজ বৃহস্পতিবার এবং আগামীকাল শুক্রবার, ৮ এবং ৯ জানুয়ারি ঠিক রাত ৮টায়, সড়কে কিংবা বাড়িতে যে যেখানেই থাকুন, সরকারের বিরুদ্ধে সজোরে স্লোগান দিন। আপনারা স্লোগান দেওয়ার পর আমি পরবর্তী নির্দেশনা দেবো।”
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে ক্রাউন প্রিন্স বলেন, “ইরানের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে সরাসরি বলছি, আপনারা ইরানের জনগণকে রক্ষা করার জন্য সামরিক ইউনিফর্ম পরেছেন এবং ইরানের সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ জনগণ আজ এক ঐতিহাসিক মূহূর্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেদের ইতিহাস লিখছে, তৈরি করছে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমার প্রশ্ন, আপনারা এই নতুন ইতিহাসের কোন পক্ষে থাকবেন? অপরাধীদের পক্ষে না কি জনগণের পক্ষে?
“কারণ, এখন আর এটা মূল ইস্যু নয় যে ইরানের দুর্নীতিগ্রস্ত এবং নিপীড়নবাদী ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠীর পতন হবে কি না; এখন মূল ইস্যু হলো কখন তাদের পতন ঘটবে। তাদের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসছে।”
“এমন একটি অবধারিত মূহূর্তে, আমি আশা করছি যে আপনারা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন, তাদের পক্ষ অবলম্বন করবেন এবং তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া থেকে বিরত থাকবেন। যদি আপনারা এই পথ অবলম্বন করেন, তাহলে শুধু নিজেদের দায়িত্ব পালন করাই নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যত এবং পরিবারের সদস্যদেরও রক্ষা করতে পারবেন আপনারা।”
ইরানের শেষ রাজা বা শাহ ছিলেন মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহালভি। ১৯৭৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নির্দেশে রাজধানী দখল করেন ইসলাপন্থি সশস্ত্র যোদ্ধারা, সম্পন্ন হয় ইসলামি বিপ্লব। তার আগেই ১৬ জানুয়ারি দেশত্যাগ করেছিলেন মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহালভি।১৯৮০ সালের জুলাই মাসে মিসরের রাজধানী কায়রোতে নির্বাসিত অবস্থায় মারা যান তিনি।
মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি’র জ্যেষ্ঠ সন্তান রেজা পাহলভি। ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি মাসে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনি; ইসলামি বিপ্লবের পর আর দেশে ফেরা হয়নি তার। বর্তমানে ওয়াশিংটনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন তিনি।
মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির মৃত্যুর পর রেজা পাহালভিকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন তার পরিবারের সদস্য ও শাহপন্থিরা।
গত দু’সপ্তাহ ধরে ব্যাপক মাত্রায় সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে। বছরের পর বছর ধরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েলের ধারাবাহিক অবনতি ও তার জেরে অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী তেহরান ও অন্যান্য ছোটো-বড় বিভিন্ন শহরের দোকানমালিকরা গত ২৮ ডিসেম্বর ধর্মঘট ডাকেন এবং বিক্ষোভ মিছিল করেন। মূলত এখন থেকেই বিক্ষোভের শুরু এবং বর্তমানে তা পুরো ইরানে ছড়িয়ে পড়েছে।
সূত্র : জেরুজালেম পোস্ট
এমআর/এসএন