যুক্তরাজ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে স্টর্ম গোরেটি। ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতির ঝোড়ো হাওয়া আর ভারী তুষারপাত দেশজুড়ে জনজীবন কার্যত স্থবির করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, বন্ধ হয়ে গেছে ট্রেন চলাচল, ব্যাহত হচ্ছে ফ্লাইট চলাচলও। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলছে, কিছু এলাকায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভারী তুষারপাত হতে পারে। ঝড় ও তুষারের এই যুগল আঘাতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, স্টর্ম গোরেটির প্রভাবে যুক্তরাজ্যে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯৯ মাইল (১৫৯ কিলোমিটার) বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং ভারী তুষারপাত হয়েছে। এতে অন্তত ৫৭ হাজার বাড়ি ও স্থাপনায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। করনওয়াল ও আইলস অব সিলির জন্য ব্রিটেনের আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস যে বিরল ‘রেড’ অ্যালার্ট জারি করেছিল, তা শেষ হয়েছে। তবে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস, ওয়েলস, গ্লস্টারশায়ার ও ইয়র্কশায়ারের কিছু অংশে তুষারপাতের জন্য এখনও ‘অ্যাম্বার’ সতর্কতা বহাল রয়েছে।
মিডল্যান্ডস অঞ্চলের কর্মকর্তারা ‘এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তুষারপাতের’ আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে কোথাও কোথাও প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার তুষার পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এতে সড়ক ও রেল যোগাযোগে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। ন্যাশনাল গ্রিড জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ৪২ হাজার ৭০০টিরও বেশি বাড়ি বিদ্যুৎহীন ছিল। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল ১৩ হাজার বাড়ি এবং ওয়েলসে প্রায় এক হাজার বাড়ি। এর আগের রাতে সারা দেশে প্রায় ৬৫ হাজার বাড়ি বিদ্যুৎ সংযোগ হারায়।
শুক্রবার পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথে ব্যাপক ব্যাঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ভারী তুষারপাত হচ্ছে মিডল্যান্ডস ও দক্ষিণ ওয়েলসে। লেক ভার্নউই এলাকায় ১৫ সেন্টিমিটার তুষার জমেছে। নটিংহ্যামে তুষারের গভীরতা পৌঁছেছে ৭ সেন্টিমিটারে।
ওয়েলস ও পিক ডিস্ট্রিক্ট এলাকায় তুষার সবচেয়ে বেশি সময় ধরে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার তুষার পড়তে পারে। এতে কিছু সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়বে, কিছু এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিও রয়েছে।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টি, বাতাস, তুষার ও বরফের জন্য ‘ইয়েলো’ অ্যালার্টও জারি রয়েছে। ফরাসি আবহাওয়াবিদদের নাম দেওয়া স্টর্ম গোরেটি বর্তমানে আটলান্টিকে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। এর বিশাল মেঘপুঞ্জ উত্তর আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বড় অংশ ঢেকে ফেলেছে।
এছাড়া ওয়েলসে ইয়র উইদফা বা স্নোডনের জন্য তুষারধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তুষারপাতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
এদিকে ভারী বৃষ্টির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়েলস ও পূর্ব ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। শুক্রবার সকালে তুষার ও বৃষ্টি কিছুটা কমবে, তবে মাটিতে তুষার জমে থাকায় সকালের অফিসযাত্রায় ভোগান্তি হতে পারে।
রেলযাত্রীদের ভ্রমণের আগে ট্রেন চলাচলের খবর জেনে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কারণ ন্যাশনাল রেলের একাধিক সেবা বাতিল বা ব্যাহত হতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিমে করনওয়ালে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার পর সব ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, কোনও বিকল্প পরিবহনও নেই। ডেভনের কিছু সেবাও বাতিল করা হয়েছে।
ইস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সারাদিন ম্যানচেস্টার পিকাডিলি ও শেফিল্ডের মধ্যে ট্রেন চালাচ্ছে না। সেখানে কোনও বিকল্প বাসও রাখা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা চালকদের তুষার ও বরফের সতর্কতা মেনে চলতে এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার পর্যন্ত গাড়ি চালানো এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রিটিশ অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএ) জানিয়েছে, শীতকালীন আবহাওয়া ‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৃশ্যমানতা কমিয়ে দিতে পারে’।
এদিকে ভারী তুষারপাতের কারণে বার্মিংহাম বিমানবন্দরের রানওয়ে ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়েছে। যাত্রীদের ফ্লাইটের অবস্থা জানতে নিজ নিজ এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এমআই/এসএন