আমদানি শুল্ক কমায় বাজারে মোবাইলের দাম অবশ্যই কমবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। আইসিটি ও টেলিকম খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম পরবর্তী সরকার অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। পাশাপাশি শুল্ক কমানোর ফলে মোবাইলের দাম কমাতে এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরো সক্রিয় হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ভয়েস ফর রিফর্ম ও টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (টিপাপ) যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আইসিটি ও টেলিকম খাতের সংস্কারনামা গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, শুল্ক কমানোর ইতিবাচক প্রভাব মোবাইল ফোনের দামে পড়বে। কম দামে হ্যান্ডসেট বিক্রি মনিটরিং করবে এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় মোবাইল ব্যবসায়ীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, তাঁদের দাবি মেনে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়েছে সরকার। সব দাবি মেনে নেওয়ার পরও মোবাইল ব্যবসায়ীদের চলমান আন্দোলন দুর্ভাগ্যজনক।
ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা মোবাইল ফোনগুলো বৈধ করা হয়েছে, আগামী তিন মাস কোনো হ্যান্ডসেট ব্লক হবে না বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।
এর আগে মোবাইল ফোনের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হ্যান্ডসেট আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছে সরকার। এনবিআরের হিসাবে, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের আমদানি হওয়া প্রতিটি মোবাইলের দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা কমবে। আর দেশে সংযোজিত ৩০ হাজার টাকার কম দামের প্রতিটি হ্যান্ডসেটের মূল্য কমতে পারে দেড় হাজার টাকা।
আইসিটি ও টেলিকম খাতে আনা সংস্কার পরবর্তী সরকার বাতিল করে দেবে কি না- এমন এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেটা করতেই পারে। তবে সেখানে আমরাও চ্যালেঞ্জ করতে পারব- আমরা কোনো বাক্য বা কোনো শব্দ কেন লিখেছি। সুতরাং পরের সরকার এসে আনডু করে দেবে সে জন্য সংস্কার হবে না- এ ধরনের মনোবৃত্তি আমাদের মধ্যে নেই। আমরা এই পলিসিগত কার্যক্রম কন্টিনিউ করব। যেটা করেছি সেটা আমরা স্পষ্টভাবে করে যাব এবং আমরা চলে যাওয়ার পরে সেটা ডিফেন্ড করার জন্য আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করব।’
আগামী সরকারের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারী বলেন, ‘আমি মনে করি, আমি তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছি না। বরং তাদের চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করে যাচ্ছি। সব সমালোচনা, সব চাপ- সবকিছু নিজের কাঁধে নিয়ে যাচ্ছি আমরা- তারা যাতে দেশের ডিজিটাল ইকোনমিকে এগিয়ে নিতে পারে। সবকিছু খুব সুন্দরভাবে আমি একা দায়িত্ব নিয়ে সব চ্যালেঞ্জ সমাধান করে দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। প্রোজেক্ট হিসেবে গত বাজেটে কোনো প্রোজেক্ট নিইনি। আমি প্রোজেক্টে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি ইনস্টিটিউশনাল ক্যাপাসিটিতে।’
সম্প্রতি ৮৮ লাখ সিম বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘হ্যাঁ ৮৮ লাখ সিম বন্ধ হয়ে গেছে। এটা সংখ্যায় বড়, কিন্তু এই সিমগুলোর ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ অব্যবহূত ছিল। আমাদের একটি আইন আছে, একজনের এনআইডির বিপরীতে এখন আর ১০-এর অধিক সিম থাকতে পারবে না। তবে একজনের এনআইডির বিপরীতে পাঁচটি সিমের যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে সেটি ভুল। মন্ত্রণালয় থেকে এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি রিকোয়েস্ট করেছে যাতে পাঁচটির বেশি সিম থাকার সুযোগ বন্ধ করা হয়। আরেকবার অনুরোধ করেছিল একজনের আইডির বিপরীতে যাতে দুটি সিম থাকে। সেখানে আমরা ১০টি পর্যন্ত সিমের অনুমতি দিয়েছি।’
দেশের টেলিকম খাতকে ভোগ্যপণ্য থেকে সামাজিক পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান প্রযুক্তিবিদ ফাহিম মাশরুর। সভাপতির বক্তব্যে ডেটা ও স্মার্টফোনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত করকাঠামোকে এই শিল্পের বিকাশের পেছনে মূল কারণ বলে মনে করেন নাগরিক সমাজের এই প্রতিনিধি।
ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে আমাদের সিভিল সোসাইটির ৯০ শতাংশ কনসার্ন আমলে নেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের আরেকটি দাবি ছিল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়ে। তথ্যের মালিকানা নিয়ে। গত মাসে পাস হওয়া বিডিপিওতে সেটা যুক্ত করা হয়েছে। এরপর আমরা সাইবার ক্রাইম তথা অনলাইন জুয়া- যা আমাদের প্রজন্মকে নষ্ট করে দিচ্ছে, সে বিষয়ে আওয়াজ তুলেছিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এনইআইআর বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রেও কিছু কথা আছে। তবে এই ডিজিটাল ডিভাইস কে, কোথা থেকে, কী কাজে ব্যবহার করছে তার ট্রেসেবিলিটি না থাকলে সাইবার ক্রাইম ও অনলাইন গ্যামব্লিং নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। কেননা এখন ভুয়া সিম দিয়ে ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট তৈরি হচ্ছে। এনইআইআর সেটি একটি সিস্টেমে নিয়ে আসবে।’
এসব বিষয়ে স্বস্তি প্রাশের পর তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি ১০০ টাকার টক টাইমে ৫৫ টাকার মতো সরকারের পকেটে। এখনো ডেটার ওপর সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ। অর্থাত্ সরকারের পক্ষে থেকেই আমাদের ইন্টারনেট বা টেলিকমিউনিকেশনকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এটি যে আসলে একটি সোশ্যাল গুডস সেটি এস্টাবলিশ করতে পারিনি। একইভাবে স্মার্টফোনের ইমপোর্ট নিয়ে গত কয়েক মাসে যে ঘটনা ঘটছে সেখানে এখনো ১৫ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ৪০ শতাংশ ৪০ শতাংশ ট্যাক্স ইনসিডেন্স রয়েছে। এটি এখনো অনেক।’
ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-আহ্বায়ক ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় বৈঠকে বক্তব্য দেন বিটিআরসির কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ, টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, বাক্কোর সভাপতি তানভীর ইব্রাহিম, আইসিটি সেক্টর দুর্নীতি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ প্রমুখ।
এসকে/টিএ