ভূমিকম্পে অপ্রস্তুত বাংলাদেশ, ৭.৫ মাত্রার কম্পনে বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়ছে

ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে মানুষের অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্নীতি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ঢাকায় ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ১০ লক্ষাধিক ভবন ধসে পড়তে পারে এবং প্রাণহানি হতে পারে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের। এমন ভয়াবহ বাস্তবতায় ভূমিকম্প মোকাবিলায় জাতীয় প্রস্তুতির ঘাটতি তুলে ধরেন বক্তারা।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ভূমিকম্পে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় করণীয় বিষয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এডাব (এসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ) এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করে।

এডাবের চেয়ারপারসন আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং পরিচালক একেএম জসীম উদ্দিনের সঞ্চালনায় সেমিনারে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্যাপস-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার। ভূমিকম্পের কারিগরি বিষয় নিয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক (অপারেশন) মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া- এটি হবেই, তবে কখন হবে তা কেউ জানে না।

অনেক দেশ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও প্রস্তুতির অভাবে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপদের মুখে।

বক্তারা জানান, ভবন নির্মাণ বিধিমালা না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ, নরম পলিমাটিতে ভবন ও রাস্তা তৈরি, গ্লাস বিল্ডিং, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, পানির স্তর নেমে যাওয়া, ভবনে বিকল্প বহির্গমন পথ না থাকা, দুর্নীতি, ভূমিকম্প বিষয়ে মানুষের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার- এসব কারণে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ঢাকায় ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ১০ লক্ষের বেশি ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। তখন মরদেহ সরানো, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া বা উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর মতো জরুরি সক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। হাসপাতালগুলোতেও বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হবে, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে, রাস্তাঘাট ভেঙে পড়বে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবে না।

এই অবস্থায় ভূমিকম্পের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে সচেতনতা ও সমন্বিত প্রস্তুতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে জানান তারা।

ভূমিকম্প মোকাবিলায় করণীয় হিসেবে বক্তারা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, কমিউনিটি, আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জরুরি পরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দেন। তারা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার, সিভিল ডিফেন্স শক্তিশালী করা, কমিউনিটি ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা দেওয়া, কমিশনার ও পৌর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল করা, কমিউনিটি তথ্য হাব তৈরি এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান।

এছাড়া ভূমিকম্প বিষয়ে স্কুল-কলেজ, পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচার, মিডিয়া ও এনজিওদের সক্রিয় ভূমিকা, হাসপাতালের সঙ্গে মানসিক ও সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম, পানি ও রাস্তা ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগকে ক্ষমতায়ন ও পর্যাপ্ত রিসোর্স দেওয়ার কথাও তুলে ধরা হয়। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানভিত্তিক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন বক্তারা।

বক্তারা আরও বলেন, ভূমিকম্প প্রাকৃতিক হলেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ মূলত মনুষ্যসৃষ্ট। এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। জনগণই সব ক্ষমতার উৎস উল্লেখ করে তারা রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল করতে সম্মিলিত চাপ তৈরির আহ্বান জানান। তারা বলেন, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

সেমিনারে অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, ওয়াহিদা বানু, গওহর নাঈম ওয়ারা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান।

পিএ/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
হবিগঞ্জে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ২ লাখ টাকা জরিমানা Jan 15, 2026
img
রাজবাড়ীতে ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল ২ মোটরসাইকেল আরোহীর Jan 15, 2026
img
পারফরম্যান্স অনুযায়ী বেতন দেওয়া উচিত ক্রিকেটারদের: নাজমুল Jan 15, 2026
img
৫ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৯৪০ কোটি ডলার Jan 15, 2026
img
ঢাকায় আসছে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল Jan 15, 2026
img
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখার ঘোষণা রাশিয়ার Jan 15, 2026
img
তারেক রহমানের সঙ্গে আমান আযমীর সাক্ষাৎ Jan 15, 2026
img
সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তরুণদেরই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে: হাবিব Jan 15, 2026
img
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ Jan 15, 2026
img
ময়মনসিংহে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ Jan 15, 2026
img
ভূমিকম্পে অপ্রস্তুত বাংলাদেশ, ৭.৫ মাত্রার কম্পনে বিপর্যয়ের শঙ্কা বাড়ছে Jan 14, 2026
img
জোট ছিল আছে, জোট ভাঙবে এমন কিছু হচ্ছে না: জামায়াত Jan 14, 2026
img
গাইবান্ধায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আসিফ গ্রেপ্তার Jan 14, 2026
img
আলোন্সোর বিদায় প্রসঙ্গে বার্সেলোনা কোচ, ‘এটাই ফুটবল’ Jan 14, 2026
img
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের সব ধরনের মার্কিন ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত Jan 14, 2026
img
বিমানের পরিচালনা পর্ষদে ড. খলিলুর রহমানসহ ৩ জন Jan 14, 2026
img
মিচেলের সেঞ্চুরিতে ভারতকে হারাল নিউজিল্যান্ড Jan 14, 2026
img
জটিল রোগে আক্রান্ত দিশা পাটানি, সতর্ক করলেন প্রাক্তন Jan 14, 2026
img
অবশ্যই সিনেমা ভালবাসি তবে অভিনয় করব না: অভিষেক Jan 14, 2026
img
তারেক রহমানের সঙ্গে ১২ দলীয় জোটের বৈঠক Jan 14, 2026