ইরানের সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনব্যবস্থা ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভারতের কাছে ইরান শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বরং আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রবেশদ্বার। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জন্য স্থলপথ বন্ধ করে রাখায় তেহরানই নয়াদিল্লির সামনে কার্যত একমাত্র বিকল্প হয়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারতের শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ এখন বড় ঝুঁকির মুখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-ইরান সম্পর্ক কখনোই আদর্শগত ঐক্যের ওপর দাঁড়ায়নি; বরং এটি বরাবরই কৌশলগত স্বার্থ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারে ইরান ভারতের জন্য এক ধরনের স্থলসেতুর ভূমিকা পালন করে এসেছে। বিশেষ করে চাবাহার বন্দর প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত সরাসরি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েছিল। তবে ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশটিতে যদি দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে বা এমন কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, যারা ভারতের প্রতি অনুকূল নয়, তবে নয়াদিল্লি তার বহু বছরের কৌশলগত প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা এই মহাদেশীয় বাণিজ্যপথ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
কেবল বাণিজ্যিক বা কৌশলগত যোগাযোগ নয়, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও ইরানের ভূমিকা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া-প্রধান ইরান পরোক্ষভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের প্রভাব সীমিত রাখতেও ভারতের জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অস্থিরতা শুধু দেশটির অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের নতুন করে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে ভারতীয় রফতানিকারকরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন। গণমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রায় দুই হাজার কোটি রুপির ভারতীয় পণ্য বর্তমানে বিভিন্ন বন্দরে আটকে আছে।
নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের পর ইরানে যদি কোনো উগ্রবাদী বা চরমভাবে অস্থিতিশীল সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইরান যদি আরও গভীরভাবে চীনের কৌশলগত বলয়ে ঢুকে পড়ে, তবে এই অঞ্চলে ভারতের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে খামেনির ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা। ইরানের চলমান টালমাটাল পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভারতের কয়েক দশকের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও বিপুল অংকের বিনিয়োগকে ব্যর্থ করে দেবে কি না—এখন সেই উত্তর খোঁজার মধ্যেই ব্যস্ত ভারতের নীতিনির্ধারকরা।
সূত্র: ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজ২৪
এবি/টিকে