অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন, সরকার হিসেবে আমরা যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন করছি, তখন আমরা দল নিরপেক্ষ। এখানে আমাদের নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা ছাড়া ভিন্ন কোনো কাজ নেই। কিন্তু যখন আমরা গণভোট করছি, সেক্ষেত্রে আমরা নিরপেক্ষ না। কারণ আমরা চাচ্ছি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাগুলো গণমানুষের দ্বারা সমর্থিত হোক। মানুষের আন্দোলনে এই জুলাই অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। সুতরাং মানুষের দ্বারাই আইনগতভাবে তা সমর্থিত হোক। সে কারণে আমরা একটি পক্ষ, আমরা চাচ্ছি হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হোক।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে জেলা প্রশাসন আয়োজিত গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং গণভোটের বিষয়ে ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, একটি প্রশ্ন বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে উৎথাপিত হয়, কেন সরকার ভোটের প্রচারে নামলো? এতে কী সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলতে চাই, আমাদের এই সরকার বিশেষ রকম সরকার। ২৪ এর ছাত্র-জনতার যে গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেল তার ফসল এই সরকার। ফলে সেই গণঅভ্যুত্থানে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছে, যে ইচ্ছার প্রকাশ ঘটেছে তা বাস্তবায়ন করায় এই সরকারের দায়িত্ব। সরকার সংস্কার করছে, বিচার করছে এবং সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আমরা অনেক আইন অধ্যাদেশ আকারে গ্রহণ করেছি, যা সংস্কারের অংশ। এই আইনগুলো পরবর্তী জাতীয় সংসদে পাস হতে হবে। তা যদি না হয় তাহলে এই পরিবর্তনগুলো এমনিতেই বাদ হয়ে যাবে। সংস্কারের জন্য সংবিধানেও কিছু পরিবর্তন করা দরকার, যা আদেশের মাধ্যমে অনেক সময় করা যায় না। সেজন্য সবার সম্মতির প্রয়োজন পড়ে এবং সেটিও পরবর্তী সংসদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। যে সমস্ত রাজনৈতিক দল নির্বাচন করছে তারা সকলেই গণঅভ্যুত্থানের অংশ। কিন্তু এরপরও আমরা ভোটের প্রচারণায় কেন নামছি? গণঅভ্যুত্থানে মানুষের মূল আকাঙ্ক্ষা যেটি ছিল বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ চাই, আমরা ভোটের অধিকার চাই, এগুলোই ছিল আন্দোলনের সময় মানুষের আকাঙ্ক্ষা।
অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, এক শতাব্দী পার হয়ে গেল কিন্তু আমাদের গণমানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যার কারণে বারবার এদেশের মানুষকে রক্ত দিতে হয়েছে। ২৪ এর আগে ৯০ একটা বড় আন্দোলন হয়েছিল। সেই সময় যে জোটগুলো আন্দোলন করেছিল তারা একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং দলিলে সই করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো সে পথে আগায়নি, তা বাস্তবায়ন করেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে হল, অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রকাশিত হলো, এগুলো যদি সত্যিই টেকসই হতে হয় তাহলে আমরা যদি একটি দলিল আকারে জুলাই সনদকে রেখে যাই, সেটি কতটুকু বাস্তবায়ন হবে এক্ষেত্রে সন্দেহ হয়। তাই এটির প্রতিকার হতে পারে গণমানুষের সমর্থন আদায় করা। আমরা যদি জনমানুষের সমর্থন আদায় করতে পারি তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা এগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবেন। এই যুক্তি থেকেই গণভোটের অবতারণা।
তিনি আরও বলেন, যারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য হচ্ছে, আপনাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন। আমি মনে করি এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এটি আপনার শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস। আপনি যদি নিরপেক্ষ থাকেন আপনার বিরুদ্ধে অনেকে অপপ্রচার চালাতে পারে, কিন্তু তিনি ভিতরে ভিতরে জানবেন যে উনি নিরপেক্ষ। যারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আপনি কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আপনি যখন আপনার দায়িত্ব পালন করছেন, নির্বাচন পরিচালনা করছেন সে ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সমগ্র প্রশাসন সব সময় সতর্ক থাকবেন যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। মানুষ যেন নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে পারেন। যদি আমরা এই অবস্থা তৈরি করতে পারি তাহলে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে এবং নির্বিঘ্নে ভোট দেবে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিতে মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
এবি/টিএ