গত সরকারের আমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পুতুলের মতো আচরণ করেছে: গভর্নর

গভর্নর বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে একাধিক আইনের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, “বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার” গত চার মাস ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে এই আইন অত্যন্ত জরুরি।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, গত সরকারের আমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পাপেটের [পুতুলের] মতো আচরণ করেছে। তারা ঠিক হলে দেশের অর্থনীতিও ঠিক হবে।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত 'ইমপ্লিকেশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভ' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, 'গত সরকারের সময় যখন ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তালি দিয়েছিল। অর্থ পাচারের সময়েও তারা চুপ ছিল। এমন আচরণ করলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না।'

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যাংকাররা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন।

এর জবাবে গভর্নর বলেন, 'আমাদের অর্থনীতির প্রতিটি খাতে নিজেদের প্রস্তুত করা প্রয়োজন। আমি বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর কাতারে মনে করি না। বাংলাদেশ এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো দেশগুলোর সমমর্যাদার দাবিদার।'

তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'এলডিসি থেকে আজ হোক বা কাল হোক; আমাদের উত্তরণ হতেই হবে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়ন, মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। কেবল নীতি থাকলেই হবে না, দক্ষতাও বাড়াতে হবে। লজিস্টিক সিস্টেম, নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ, আইসিটি, শিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এই উত্তরণ প্রক্রিয়ার বড় অংশ। সামান্য সুবিধার জন্য বড় সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।'

অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ মুদ্রানীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'শুধুমাত্র মুদ্রানীতি কঠোর করলেই দেশে মূল্যস্ফীতি কমবে না, কারণ এটি রাজস্বসহ আরও বহু বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে ইতোমধ্যে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারেন।'

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে, যেখানে সরকার নিয়েছে ২৭ শতাংশ; যা ভবিষ্যতে ৩২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া কেবল মনিটারি পলিসি দিয়ে অর্থনীতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমান সরকারকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রভাব বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা একমত হননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই এসব সমস্যা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে'।

সুদের হার প্রসঙ্গে গভর্নর স্বীকার করেন যে বর্তমান হার বেশি। তবে তিনি বলেন, 'ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে এক অঙ্কের সুদের হার বিরল ছিল। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ফলে সংকোচন হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তবে আশার কথা হলো, আমানত প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সুশাসন ও গ্রাহক আস্থা বাড়লে এবং খেলাপি ঋণ কমলে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি দুই-ই কমে আসবে।'

ব্যাংক খাতের সংস্কারে 'স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী' বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। তিনি বলেন, 'আমরা সরকারের কাছে একাধিক আইনের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স এবং ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অর্ডিন্যান্স পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা এবং নয়টি এনবিএফআইকে অবসায়নের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, "বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার" গত চার মাস ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। সেখানে কোনো অগ্রগতি হয়নি।'

গভর্নর সতর্ক করে বলেন, 'ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে এই আইন অত্যন্ত জরুরি। মৌলিক পরিবর্তন আনতে গেলে কিছু প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী বাধা সৃষ্টি করছে। দেশকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এই স্বার্থান্বেষী মহলকে প্রতিহত করতে হবে, অন্যথায় দেশ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

এবি/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
বিমানবাহিনী ও সিইটিসির মধ্যে ইউএভি প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষর Jan 28, 2026
img
রাজনৈতিক সংগ্রামের অগ্রভাগে থাকে সাংস্কৃতিক কর্মীরা: রিজভী Jan 28, 2026
img
‘তারেক বসন্ত’ লিখে জামায়াতের ছবি পোস্ট ছাত্রদল নেতা আবিদুলের, পরে সংশোধন Jan 28, 2026
img
হাজী জসিম উদ্দিনের পক্ষে ভোট চাইলেন সংগীত শিল্পী আসিফ আকবর Jan 28, 2026
img
সিইসির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক আজ Jan 28, 2026
img
আদালতের রায়ে চেয়ারম্যান, ৪ বছর পর শপথ নিলেন জামায়াত নেতা Jan 28, 2026
img
শহীদ জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আ.লীগ নেতার বিএনপিতে যোগদান Jan 28, 2026
img
কেবল নেতার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রত্যাশিত পরিবর্তন সম্ভব না: চরমোনাই পীর Jan 28, 2026
img

পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়

একজন সঙ্গীত শিল্পীর প্লেব্যাক করব না বলতে সাহস লাগে Jan 28, 2026
img
যুব সমাজ ও নতুনরা ভোটের চিত্র বদলে দেবে: সানজিদা তুলি Jan 28, 2026
img
নির্বাচনের ফলাফল না নিয়ে আমরা কেউ বাড়ি ফিরব না: আবু আশফাক Jan 28, 2026
img
পুরোনো বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলন একা লড়ছে: চরমোনাই পীর Jan 28, 2026
img
গত সরকারের আমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পুতুলের মতো আচরণ করেছে: গভর্নর Jan 28, 2026
img
নাসীরুদ্দীনের পাটওয়ারীর অভিযোগের প্রতিক্রিয়া জানালেন মির্জা আব্বাস Jan 28, 2026
img
নির্বাচনকালীন ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় মেটার উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে: লুৎফে সিদ্দিকী Jan 28, 2026
img
ডাকসু নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যে শিক্ষক সমিতি থেকেও বহিষ্কার সেই জামায়াত নেতা Jan 28, 2026
img
ভোটকে কেন্দ্র করে জান্নাতের টিকেট বিক্রিকারীরা মুনাফিক: পার্থ Jan 28, 2026
img
গাইবান্ধায় পাচারকালে ২০০ বস্তা সার জব্দ, ২০ হাজার টাকা জরিমানা Jan 28, 2026
img
ট্রাম্পের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার চিন্তায় হলিউডের তারকারা Jan 28, 2026
img
সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে পারব: তারেক রহমান Jan 28, 2026