৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে স্বীকৃতি দিচ্ছে স্পেন

স্পেন সরকার প্রায় পাঁচ লাখ অ–নথিভুক্ত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে যখন অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি বাড়ছে, তখন স্পেনের এই উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে স্পেনের অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইস বলেন, এই সিদ্ধান্তের আওতায় আসা অভিবাসীরা দেশের যেকোনো অঞ্চল ও যেকোনো খাতে কাজ করার সুযোগ পাবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আনুমানিক হিসাবের কথা বলছি। সংখ্যাটি কমবেশি হতে পারে, তবে তা প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মতো।’ সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্পেনে ইতিমধ্যে বসবাসরত অভিবাসীদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, কর্মী সংকট মোকাবিলা এবং জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত চাপ কমাতে স্পেনের অভিবাসন প্রয়োজন। তাঁর মতে, কম জন্মহারের কারণে পেনশন ব্যবস্থা ও কল্যাণ খাতে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা সামাল দিতে অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বহু অ–নথিভুক্ত অভিবাসী। পেরুর নাগরিক ৩০ বছর বয়সী জোয়েল কাসেদা নামে এক অভিবাসী কৃষিকাজে দুর্ঘটনায় বাঁ হাত হারানোর পরও প্যাকেট ডেলিভারির কাজ করে জীবিকা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ তাঁর মতো অনেকের জন্য আশার আলো। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এতে ছয় বছর ধরে কোনো কাগজপত্র ছাড়াই কাজ করার পর বৈধ হওয়ার সুযোগ মিলবে। আমি আমার সঙ্গী ও মেয়েকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারব।’

স্পেনে হাজার হাজার অভিবাসী তথাকথিত ‘ব্ল্যাক ইকোনমি বা কালো অর্থনীতিতে’ কাজ করেন। বৈধ মর্যাদা পেতে তাঁদের বছরের পর বছর জটিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এনজিও প্ল্যাটফর্ম ফর আনডকুমেন্টেড ইমিগ্র্যান্টসের প্রতিনিধি লেতিসিয়া ভান ডার ভেনেত বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের মধ্যে স্পেনের এই নীতি মানবিক ও বাস্তবসম্মত। তাঁর ভাষায়, ‘আটলান্টিকের দুই পাড়েই যখন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তখন এই সিদ্ধান্ত মানবিকতা ও সাধারণ বোধের পরিচয় দেয়।’

এই সিদ্ধান্তকে পুরো সমাজের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন ঘানার নাগরিক ওসমান উমের। ইউরোপে পৌঁছাতে গিয়ে তিনি পাঁচ বছর ধরে কঠিন পথ পাড়ি দেন, একপর্যায়ে সাহারা মরুভূমিতে পাচারকারীদের হাতে পরিত্যক্ত হন এবং নিজের প্রস্রাব পান করে বেঁচে যান। স্পেনে পৌঁছে একসময় তিনি রাস্তায় বসবাস করেন। পরে একটি পরিবার তাঁকে দত্তক নেয়।

বর্তমানে তিনি ইউরোপের একটি শীর্ষ ব্যবসায়িক স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে নাসকো ফিডিং মাইন্ডস নামে একটি এনজিও পরিচালনা করছেন।

ওসমান উমের বলেন, এই বৈধকরণের ফলে অভিবাসীরা আইনসম্মতভাবে কাজ করতে পারবেন, কর ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অবদান রাখবেন এবং কম জন্মহারের দেশে পেনশন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবেন।

সেনেগাল থেকে ১৮ বছর আগে স্পেনে আসা লামিনে সারও এই উদ্যোগকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তিনি ‘টপ মান্তা’ নামের একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেন, যা রাস্তায় চাদরের ওপর নকল পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া অভিবাসীদের বাস্তবতা তুলে ধরে। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে অভিবাসীরা কালো অর্থনীতিতে এক ধরনের শোষণের শিকার না হয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারবেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অন্তত পাঁচ মাস ধরে স্পেনে বসবাস করছেন এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন-এমন অভিবাসীরা এই বৈধকরণের আওতায় আসবেন। আবেদনকারীদের যেসব সন্তান ইতিমধ্যে স্পেনে বসবাস করছে, তারাও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবে। আবেদন গ্রহণ শুরু হবে এপ্রিল মাসে এবং চলবে জুন পর্যন্ত।

এই সিদ্ধান্ত একটি ডিক্রির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, যা পার্লামেন্টে পাস করানোর প্রয়োজন হবে না। কারণ পার্লামেন্টে সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই এবং বিরোধী রক্ষণশীল পিপলস পার্টি ও কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টির তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল।

ভক্স পার্টির নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল অনলাইনে দেওয়া এক বার্তায় এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ‘পাঁচ লাখ অভিবাসীর আগমন আরও পাঁচ লাখ মানুষকে আকৃষ্ট করবে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।’

তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসন ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। মরক্কো ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার ও সহযোগিতা বাড়াতে স্পেন সরকারের করা চুক্তির ফলেই এই হ্রাস ঘটেছে।

পিএ/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

img
২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় বিয়ে বিতর্কে মুখ খুললেন হিরণ! Jan 29, 2026
img
প্রায় ৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে স্বীকৃতি দিচ্ছে স্পেন Jan 29, 2026
img
ঘুষ নিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি, ২০ মাসের কারাদণ্ড Jan 29, 2026
img
জন্মদিনে সাহেব-সুস্মিতার ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত, ফের উসকে উঠল প্রেমের গুঞ্জন! Jan 29, 2026
img

টাইমকে সাক্ষাৎকার

কোনো দল নিষিদ্ধ নয়, অপরাধীর শাস্তি চান তারেক রহমান Jan 29, 2026
img
প্লে-ব্যাক থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন অরিজিৎ, বিশ্বাসই হচ্ছে না রাজ-শুভশ্রীর! Jan 29, 2026
img
চীনের সহায়তায় যুক্তরাজ্যকে আরও নিরাপদ ও ধনী করতে চাই: কিয়ার স্টারমার Jan 29, 2026
img
ইউএনডিপির সঙ্গে বিএসইসির সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর Jan 29, 2026
img
মাচাদো ও ভেনেজুয়েলার নতুন সরকারে ভরসা নেই মার্কিন গোয়েন্দাদের Jan 29, 2026
ডিজিটাল এক্সপোতে নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন Jan 29, 2026
শত্রুদের জন্য ‘মানসিক যন্ত্রণা’ তৈরি করতে কিমের নতুন পরিকল্পনা Jan 29, 2026
আদালত ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে: মিনেসোটার বিচারক Jan 29, 2026
১০ মিনিটে গোটা বিশ্বের সারাদিনের সর্বশেষ আলোচিত সব খবর Jan 29, 2026
সরকারি কর্মকর্তাদের ৫ বছরের বেশি চাকরি করা উচিত নয়, বললেন প্রধান উপদেষ্টা Jan 29, 2026
দারিদ্র্য থেকে ডাক্তারি যাত্রা Jan 29, 2026
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রিয় জুটি: নতুন অধ্যায় শুরু Jan 29, 2026
img
বরিশালে সেনাবাহিনীর অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র-বিস্ফোরক উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৮ Jan 29, 2026
img
ধানের শীষের বিজয় মানে গণতন্ত্রের বিজয় : অপর্ণা রায় Jan 29, 2026
img
বিএনপির জয় নিশ্চিত বুঝেই ষড়যন্ত্র হচ্ছে : আবদুস সালাম Jan 29, 2026
img
২৯ জানুয়ারি: ইতিহাসের এই দিনে আলোচিত যত ঘটনা Jan 29, 2026