প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলাদেশ-চীন পার্টনারশিপ ফোরামের বৈঠক

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ-চীন পার্টনারশিপ ফোরামের একটি প্রতিনিধিদল।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন চীনের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী ও শিল্পখাতের নেতারা বিশেষ করে বায়োমেডিক্যাল, অবকাঠামো, ডিজিটাল ও আইন খাতের প্রতিনিধিরা। গত বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ বৈঠক হয়।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, বৈঠকে সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক ও খ্যাতনামা বায়োমেডিক্যাল বিজ্ঞানী শিন-ইউয়ান ফু ড. ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন। বাংলাদেশি শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কাজ করতে এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখতে তিনি তার আগ্রহের কথা জানান।

ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজির বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সিনিয়র উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওং এবং ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকের (সিঙ্গাপুর) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউকিং ইয়াও বাংলাদেশে কাজ করার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে অন্তত ২২টি দেশে টিকা রপ্তানি করেছে।

ওয়ালভ্যাক্স যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং পিসিভি ও এইচপিভি টিকার লোকালাইজেশন নিয়ে কাজ করছে। ইন্দোনেশিয়ায় একটি ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে স্থানীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন- সিঙ্গাপুরের রোবোটিক্স সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জিনসং ওয়াং; ফোর্ডাল ল’ ফার্মের ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ইউয়ান ফেং; বেইজিং উটং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লি রান; চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রকল্প বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট গাও ঝিপেং; চায়না হুনান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের ইনভেস্টমেন্ট ডিরেক্টর শু তিয়ানঝাও; চায়না সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুয়া জিয়ে; পাওয়ারচায়না ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের ওভারসিজ মার্কেটসের জেনারেল ম্যানেজার চেন শুজিয়ান; ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মা শিয়াওইউয়ান; এবং চীন-বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যালেক্স ওয়াং জেকাই।

প্রতিনিধিদলটি প্রধান উপদেষ্টাকে জানান, তারা বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটালাইজেশন বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিভা ও সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। বৈঠকে ড. ইউনূস চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন, যা মাইক্রোক্রেডিট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল।

তিনি বলেন, আমি চীনের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে দেখেছি কীভাবে মানুষের জীবন বদলে যাচ্ছে। পরে চীনা সরকার এসব নীতির অনুপ্রেরণায় নিজস্ব কর্মসূচি চালু করে। গত বছরের মার্চে চীন সফরের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, সে সময় তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

‘তিনি (শি জিনপিং) আমাকে বলেছেন, তিনি আমার বই পড়েছেন এবং এর নীতিগুলো অনুসরণ করেছেন। সেটি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের মুহূর্ত ছিল’- বলেন প্রধান উপদেষ্টা। শিগগির নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি এই দায়িত্ব ছাড়বো এবং নতুন সরকার গঠিত হবে। কিন্তু আমাদের দুই দেশের কাজ চলতেই থাকবে।

প্রতিনিধিদল স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতার বিভিন্ন সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন এবং প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, স্বাস্থ্যখাতই সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কীভাবে স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা যায় যাতে চিকিৎসক ও রোগীরা কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারেন, চিকিৎসা ইতিহাস ডিজিটালি সংরক্ষণ করা যায় এবং সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে সামাজিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ওষুধ তৈরিতে খরচ পড়ে পয়সা, অথচ বিক্রি হয় ডলারে। আমরা এমন সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি গড়ে তুলতে চাই, যারা লাভের চেয়ে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত টিকার দাবির কথা স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, আমরা পেটেন্টমুক্ত টিকার পক্ষে কথা বলেছিলাম এবং বাধার মুখে পড়েছিলাম। ভোটের সময় ১০টি দেশ বিরত ছিল। তারা বলেছিল, ধনী দেশগুলো টিকা কিনে দরিদ্র দেশকে দেবে। আমরা বলেছি আমাদের দান নয়, প্রয়োজন ন্যায্যতা। মানুষ মারা যাচ্ছিল, আর কেউ কেউ টাকা কামাচ্ছিল এটা লজ্জাজনক।

উত্তরাঞ্চলে একটি ‘হেলথ সিটি’ গড়ে তোলার স্বপ্নের কথাও জানান তিনি। বলেন, চীন সফরের সময় আমি উত্তরাঞ্চলে এক হাজার শয্যার একটি আন্তর্জাতিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছি। অঞ্চলটি দরিদ্র হলেও ভারত, নেপাল ও ভুটানের কাছাকাছি হওয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, প্রস্তাবিত হেলথ সিটিতে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র, টিকা উৎপাদন কেন্দ্র, ওষুধ শিল্প ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি হাব থাকবে। একটি শহরেই সব স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম হবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের মানুষও সেখানে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিতে পারবে।

প্রধান উপদেষ্টা চীনা সরকারের অব্যাহত সহযোগিতা ও সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

এসএস/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
উত্তরায় পার্কিং করা বাসে আগুন Jan 30, 2026
img
‘তীব্র শীতে’ কিয়েভে হামলা বন্ধে রাজি হয়েছেন পুতিন Jan 30, 2026
img
১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে নোয়াখালীকে বিভাগ করা হবে: হান্নান মাসউদ Jan 30, 2026
img
বিশ্বকাপে না যাওয়া ক্রিকেটারদের জন্য নতুন টুর্নামেন্টের ঘোষণা Jan 30, 2026
img
পাকিস্তান সিরিজেই জাতীয় দলে ফিরছেন সাকিব! Jan 30, 2026
img
কলকাতা বহু দিন ধরে টানছে: অনুশকা শঙ্কর Jan 30, 2026
img
চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে নতুন মোড়! Jan 30, 2026
img
জবির বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আজ, প্রতি আসনে লড়বে ১০২ জন Jan 30, 2026
img
অস্কারে যাচ্ছেন বাংলাদেশি সাংবাদিক Jan 30, 2026
img
ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে কালো টাকা ছড়ানো হচ্ছে: শহিদুল ইসলাম Jan 30, 2026
img
ইনস্টাগ্রাম থেকে হঠাৎ উধাও কোহলি! Jan 30, 2026
img
আশা করি ইরানে হামলা চালাতে হবে না: ট্রাম্প Jan 30, 2026
img
বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষে লাহোর, ২য় অবস্থানে রাজধানী ঢাকা Jan 30, 2026
img
নোয়াখালীতে জামায়াত আমীরের জনসভায় নেতাকর্মীদের ঢল Jan 30, 2026
img
বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে ভারতের ম্যাচ বর্জনের চিন্তায় পাকিস্তান Jan 30, 2026
img
আজ ইশতেহার ঘোষণা করবে এনসিপি Jan 30, 2026
img
নাইজারের বিমানবন্দরের কাছে গোলাগুলি, নিহত ২০ Jan 30, 2026
img
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলাদেশ-চীন পার্টনারশিপ ফোরামের বৈঠক Jan 30, 2026
img
জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের সহ-সভাপতি বাংলাদেশ Jan 30, 2026
img
৫০তম বিসিএস পরীক্ষা শুরু Jan 30, 2026