হুমায়ুন ফরিদী ছিলেন শিক্ষক, বন্ধু ও অভিভাবক: চঞ্চল চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৩০ পিএম | ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের অসংখ্য চরিত্রকে অমর করে তোলা কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী-কে নিজের জীবনের তিনটি বিশেষ জায়গায় স্থান দিয়েছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী।
তার ভাষায়, ফরিদী কেবল সহশিল্পী নন-তিনি ছিলেন শিক্ষক, বন্ধু ও অভিভাবক; এক অনন্য প্রেরণার উৎস।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চঞ্চল বলেন, সুযোগ পেলে তিনি আর একবার হলেও ফরিদী ভাইয়ের সঙ্গে ডিনারে বসতে চাইতেন। সঞ্চালকের প্রশ্ন ছিল-কোনো প্রয়াত বড় অভিনেতার সঙ্গে যদি একবার বসার সুযোগ পান, কাকে বেছে নেবেন? উত্তরে আবেগঘন কণ্ঠে চঞ্চল বলেন, যার সঙ্গে আমার বসার অভ্যাস ছিল, অনেক ডিনার করেছি, রাতভর আড্ডা দিয়েছি-ওনাকেই আবার আনতে চাই। আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না যে উনি এভাবে চলে যাবেন। তিনি ফরিদী ভাই, আমাদের হুমায়ুন ফরিদী।
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান ফরিদী। শুক্রবার তার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রায় দেড় দশক পরও সহকর্মী ও ভক্তদের স্মৃতিতে তিনি সমান উজ্জ্বল।
ফরিদীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে চঞ্চল বলেন, সম্পর্কটা ছিল কখনো গুরু-শিষ্যের, কখনো বন্ধুর, আবার কখনো অভিভাবকের মতো।
চঞ্চলের অভিনীত কোনো কাজ দেখলে ফোন করে মতামত জানাতেন ফরিদী। তখন বাটন ফোনের সময়। কাজ দেখেই বলতেন, ‘এই চঞ্চল, তোর কাজটা দেখলাম। ভালো হয়েছে। তবে মুখটা একটু তেলতেলে লাগছিল, পরেরবার মেকআপে খেয়াল রাখিস।’ আবার কখনো বলতেন, ‘কিরে, কী করছিস? আয় বাসায়, আড্ডা দেই।’”
চঞ্চলের মতে, অভিনয়ের প্রকৃত শিক্ষক ছিলেন ফরিদী। ওই মাপের গুণী অভিনেতা বাংলাদেশে বহু বছর পর এসেছিলেন। ভবিষ্যতে কবে আসবেন, জানা নেই।
মানুষ হিসেবে ফরিদী ছিলেন বন্ধুবৎসল ও আন্তরিক। আড্ডাপ্রিয় এই মানুষটির ভাবনা ছিল অনেকটাই দার্শনিকের মতো-তার সাক্ষাৎকার, জীবনদৃষ্টি ও শিল্পভাবনা ছিল আলাদা মাত্রার।
১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকায় জন্ম হুমায়ুন ফরিদীর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় তিনি যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটার-এর সঙ্গে। মঞ্চ দিয়েই শুরু তার অভিনয়জীবন। ১৯৬৪ সালে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটকে অভিনয় করেন; স্কুলজীবনেই নির্দেশনা দেন ‘ভূত’ নাটক।
মঞ্চে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ত্রিরত্ন’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’। টিভি নাটকে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য উপস্থিতি। ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘মহুয়ার মন’, ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘চানমিয়ার নেগেটিভ পজিটিভ’, ‘অযাত্রা’, ‘পাথর সময়’, ‘দুই ভাই’, ‘শীতের পাখি’, ‘সংশপ্তক’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘সমুদ্রে গাঙচিল’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘মোহনা’, ‘বিষকাঁটা’, ‘ভবের হাট’ ও ‘শৃঙ্খল’সহ বহু নাটকে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
বিশেষ করে ‘সংশপ্তক’ নাটকে ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয় তাকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়-যে চরিত্র আজও দর্শকের মনে অম্লান।
চলচ্চিত্রেও ছিল তার সফল পদচারণা। ‘একাত্তরের যিশু’, ‘সন্ত্রাস’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামলছায়া’সহ নানা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনি। বাণিজ্যিক ধারার সিনেমায় খল চরিত্রেও পেয়েছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৪ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৮ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
ব্যক্তিজীবনে দুবার বিয়ে করেন ফরিদী। অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তফা-র সঙ্গে সংসার শুরু করলেও ২০০৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
এমআই/টিএ