কাকের অনুপস্থিতিতে ঢাকার আকাশে নীরবতা
ছবি: সংগৃহীত
০৪:১০ পিএম | ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ঢাকায় এখন ভোর নামলে শব্দের ভেতর এক কমতির টের পাওয়া যায়। হর্ন আছে, ড্রিল আছে, মানুষের হাঁকডাক আছে, কিন্তু যে শব্দ একসময় সকালের বাতাস ভরে রাখত, সেই কা কা রব যেন ক্রমে পেছনে সরে যাচ্ছে। বহুদিন ধরেই পাখিপ্রেমীরা সতর্ক করছিলেন, শহর থেকে কাক কমছে। তখন কথাটা বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে চোখের সামনেই।
স্কটল্যান্ড থেকে ফিরে ২০২৪ সালে যখন আবার নিজের পাড়ায় সকালের হাঁটায় বের হতাম, প্রথম ধাক্কাটা লাগে শব্দে। যে ছাদে, যে বৈদ্যুতিক তারে, যে অল্প সবুজে ডজন ডজন কাক বসে থাকত, সেখানে অদ্ভুত শূন্যতা। পাড়া ঘুরে একই প্রশ্ন শুনি, কাকগুলো গেল কোথায়।
একসময় ঢাকার সকাল মানেই ছিল কাকের উপস্থিতি। কাচাবাজারের উচ্ছিষ্ট, রাস্তার পাশের ডাস্টবিন, হোটেলের ফেলে দেওয়া খাবার, সবকিছু ঘিরে তাদের ব্যস্ততা। সন্ধ্যায় বড় বড় দলে ফিরে আসা, গাছভর্তি কালো ছায়া, আকাশজুড়ে ডাক, এগুলো ছিল নগর জীবনের দৈনন্দিন দৃশ্য। বিরক্তিকর হলেও তারা ছিল স্থায়ী।
তাদের হারিয়ে যাওয়াটা ঘটছে ধীরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে। একদিন মনে হয় কম, আরেকদিন খেয়াল করলে পুরো দলটাই নেই। বিজ্ঞান তথ্য জোগাড় করার আগেই মানুষ অনুপস্থিতি টের পায়। সকালের নীরবতা সেই অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
শহরের সঙ্গেই জন্মানো এক পাখি
বিশ্বজুড়ে কাকের প্রজাতি চল্লিশের বেশি। অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বড় অংশ ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই তাদের দেখা মেলে। হিমালয় থেকে দ্বীপ, উপকূল থেকে জঙ্গল, সর্বত্র অভিযোজন ক্ষমতায় তারা অনন্য।
দক্ষিণ এশিয়ায় পাতিকাক দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের বসতির সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত। উচ্ছিষ্ট খাওয়া, গাছে বাসা বাঁধা, জনবহুল পরিবেশে বংশবিস্তার, সবকিছুতেই তারা দক্ষ। দাঁড়কাক তুলনামূলক সবুজপ্রধান এলাকা পছন্দ করলেও শহর ছেড়ে যায় না সহজে।
ঠিক এই কারণেই তাদের কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তারা সংবেদনশীল বনপাখি নয়, টিকে থাকার প্রতীক। এমন প্রজাতিও যদি শহরে সংকটে পড়ে, তবে বোঝা যায় নগর প্রতিবেশে গভীর পরিবর্তন ঘটছে।

কী বদলে গেছে
কারণ একক নয়, বহুস্তরীয়।
প্রথমত আবাসস্থল। একসময় ঢাকার বাড়িগুলোতে ছিল আঙিনা, ফলের গাছ, বড় ছায়াদার বৃক্ষ। শহরের চারপাশে জলাভূমি ছিল বিস্তীর্ণ। এখন সড়ক প্রশস্তকরণ, ফ্লাইওভার, আবাসন প্রকল্প আর তথাকথিত সৌন্দর্যায়নে গাছ কমেছে দ্রুত। বাসা বাঁধার মৌসুমেই গাছ ছাঁটাই হওয়ায় ডিম ও ছানা নষ্ট হচ্ছে।
কাক শহর সহ্য করতে পারে, কিন্তু বাসা বাঁধার নিরাপদ জায়গা ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় চাপ খাদ্য। উন্মুক্ত ডাস্টবিনের যুগ প্রায় শেষ। কাভার্ড বিন, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, কমপ্যাকশন ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হলেও উচ্ছিষ্টভোজী পাখির খাদ্য কমিয়েছে। উল্টো যে বর্জ্য খোলা থাকে, তা প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও চিকিৎসা বর্জ্যে দূষিত, যা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
তৃতীয়ত দূষণ ও তাপচাপ। বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় প্রায়ই থাকে ঢাকা। সূক্ষ্ম দূষণকণা পাখির শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে। কংক্রিট বাড়ায় তাপমাত্রা, কমায় ছায়া, কঠিন করে তোলে বাসা বাঁধা।
চতুর্থত মানুষের অসহিষ্ণুতা। শহর যত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, ততই অনিয়ন্ত্রিত প্রাণীর জায়গা কমছে। কাককে অনেকে নোংরা বা কোলাহলপূর্ণ মনে করেন। বাসা ভাঙা, তাড়ানো, নিপীড়নও ঘটছে।

অনুপস্থিতির মূল্য
কাক শুধু উচ্ছিষ্টভোজী নয়, নগর পরিচ্ছন্নতায় তাদের ভূমিকা আছে। মৃত প্রাণী সরানো, জৈব বর্জ্য ভাঙন, পুষ্টি চক্রে অবদান, সবই করে তারা।
সাংস্কৃতিক দিক থেকেও তাদের উপস্থিতি গভীর। বয়োজ্যেষ্ঠরা স্মরণ করেন সন্ধ্যার দলবদ্ধ আবাস। রিকশাচালকরা বলেন উচ্ছিষ্ট দিলে কাকের ভিড় হতো। ভবনের কেয়ারটেকাররা ছাদের বাসার কথা বলেন। এগুলো বৈজ্ঞানিক জরিপ নয়, কিন্তু সামাজিক স্মৃতি হিসেবে তা মূল্যবান।
কোনো শহরের শব্দভূমি বদলে গেলে মানুষ তা অনুভব করে।
বিলুপ্ত নয়, সতর্ক সংকেত
কাক পুরোপুরি হারায়নি। বাজার, নদীতীর, কম পরিচর্যার এলাকায় এখনও দেখা মেলে। যেখানে গাছ আছে, খাদ্য আছে, বিঘ্ন কম, সেখানে তারা টিকে।
কিন্তু অসম বণ্টনই সংকেত দেয়, শহর সর্বত্র বাসযোগ্য থাকছে না।
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কাকের পতন ধীরে ঘটেছে, উপলব্ধি এসেছে দেরিতে। নগর পাখি পর্যবেক্ষণ না থাকায় ঢাকায় প্রকৃত পতনের পরিমাণ নথিভুক্ত হয়নি। সাধারণ প্রজাতি সংকটে না পড়া পর্যন্ত নগর জীববৈচিত্র্য গুরুত্ব পায় না, এ বাস্তবতা এখানেও স্পষ্ট।
নীরবতার ভাষা
কাকের গল্প নস্টালজিয়া নয়। তারা আদরের পাখি ছিল না, কিন্তু ছিল স্থায়ী। নগর বিশৃঙ্খলায়ও অভিযোজিত ছিল অসাধারণভাবে।
তাদের কমে যাওয়া বলে দেয়, শহর বদলাচ্ছে দ্রুত, কঠোরভাবে।
শহরকে শুধু সড়ক, টাওয়ার, ফ্লাইওভার দিয়ে মাপলে হবে না। কী হারাল, সেটিও হিসাব জরুরি। যে পাখি একসময় ভোরের অ্যালার্ম ছিল, তার অনুপস্থিতি আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
প্রশ্নটা তাই রয়ে যায়, আমরা কি নীরবতার শব্দ শুনছি, নাকি সেটাকেও শহুরে উন্নয়নের অংশ ভেবে মেনে নিচ্ছি।
এসএন