© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইউরোপকে মার্কিন সহযোগিতার আশ্বাস রুবিওর; তবে শর্ত গতিপথ বদলানোর

শেয়ার করুন:
ইউরোপকে মার্কিন সহযোগিতার আশ্বাস রুবিওর; তবে শর্ত গতিপথ বদলানোর

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৭:১৬ এএম | ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
শনিবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের 'মুষ্টিবদ্ধ হাত'কে যেন 'মখমলের দস্তানায়' মুড়িয়ে নমনীয়ভাবে পেশ করলেন। তিনি উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় নেতাদের আশ্বস্ত করলেন যে, দীর্ঘদিনের এই অংশীদারিত্বের প্রতি আমেরিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এর বিনিময়ে বিভিন্ন বিষয়ে ইউরোপকে তাদের নীতি বদলানোর যে কঠোর দাবি ওয়াশিংটন জানিয়ে আসছিল, তা থেকে তিনি একচুলও সরে আসেননি।

ওয়াশিংটন ট্রান্সআটলান্টিক জোট ছাড়বে না—রুবিও'র এমন বার্তায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন উপস্থিত ইউরোপীয় মিত্ররা। অথচ ঠিক এক বছর আগে এই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন ইউরোপের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ নিয়ে আক্রমণাত্মক কথা বলেছিলেন, তখন পাথরমুখ হয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না ইউরোপীয় নেতাদের।

আমেরিকা যে ইউরোপেরই 'সন্তান' এবং দুই মহাদেশের ভাগ্য 'একসূত্রে গাঁথা'—এমন মন্তব্যে দুবার করতালিতে সিক্ত হন রুবিও। তবে তার মিষ্টি কথার আড়ালে ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি। বার্তাটি স্পষ্ট—ইউরোপ যদি নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব না নেয় এবং আমেরিকার মতো একই মূল্যবোধ ধারণ না করে, তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন, অন্যথায় ওয়াশিংটন 'একা চলার' নীতি গ্রহণ করবে।

রুবিও বলেন, "আমরা এমন মিত্র চাই যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে। তাহলে কোনো শত্রু আমাদের সম্মিলিত শক্তি পরীক্ষা করার সাহস করবে না।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা আমেরিকার মানুষ পশ্চিমের পতন ভদ্রভাবে চেয়ে দেখতে আগ্রহী নই। আমরা বিচ্ছেদ চাই না, বরং পুরোনো বন্ধুত্বকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই।"

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই ইউরোপের সমালোচনা করে বলেন, তারা নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে। তিনি ন্যাটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক স্থিতাবস্থা ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছরে তিনি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ঠিক সেটাই করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা যখন ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই রুবিও এই ভাষণ দিলেন। ট্রাম্পের পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ, গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রত্যাহারের কারণে ইউরোপীয়রা শঙ্কিত। তারা ভাবছিল যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছে।

গত বছরের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ভ্যান্সের ভাষণ এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি ইউরোপীয় নেতাদের বলেছিলেন, তাদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি চীন বা রাশিয়া নয়, বরং 'নিজেদের ভেতর থেকেই' আসছে। ভ্যান্সের সেই মন্তব্যই এখন হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি।

ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এই সপ্তাহে মিউনিখে পৌঁছানোর সময়ও ভ্যান্সের সেই কথাগুলো ভুলতে পারেননি। সম্মেলনে অনেকেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সমাপ্তির দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। ওয়াশিংটন এবং তার ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে এখন খুব কম বিষয়েই মতের মিল রয়েছে।

রুবিও'র ভাষণের আগে শুক্রবার জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ বলেন, "ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিভেদ তৈরি হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের দাবি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং সম্ভবত তারা তা হারিয়েও ফেলেছে।"

বৃহস্পতিবার মিউনিখের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় রুবিও নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "সত্যি বলতে পুরোনো পৃথিবী আর নেই। আমরা ভূ-রাজনীতির এক নতুন যুগে বাস করছি।"

শনিবারের ভাষণে তিনি একই বার্তা দেন, তবে কিছুটা নরম সুরে। মিউনিখের শ্রোতাদের উদ্দেশে রুবিও বলেন, "প্রয়োজন হলে আমরা একাই কাজ করতে প্রস্তুত। তবে আমাদের পছন্দ এবং আশা হলো, ইউরোপে আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়েই আমরা কাজ করব।"

দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে রুবিও আরও বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ একে অপরের পরিপূরক।" যদিও এই সম্পর্কটি বর্তমানে চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।

রুবিও স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মাঝে মাঝে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা 'সরাসরি এবং জরুরি' ভঙ্গি দেখাতে পারে। তবে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এই জোটের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, "আমরা এমন মিত্র চাই যারা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। যারা বোঝে যে আমরা একই মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী। এবং যারা আমাদের সঙ্গে মিলে একে রক্ষা করতে ইচ্ছুক ও সক্ষম।"

ভ্যান্স সোশ্যাল মিডিয়ায় রুবিও'র বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, "এটি একটি দুর্দান্ত ভাষণ। পুরোটা দেখার মতো।"

এক বছর আগে ভ্যান্সের সুরের সঙ্গে রুবিও'র সুরের আকাশ-পাতাল তফাত ছিল। কিন্তু ইউরোপের প্রতি বার্তাটি ছিল একই: সংস্কার করো, নতুবা নিজের পথ নিজেই দেখো।

টিজে/টিকে 

মন্তব্য করুন