চিকিৎসা সেবা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রশ্ন তুললেন তাসনিম জারা
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪৯ পিএম | ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দেশে চিকিৎসা সেবা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের এক বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডা. তাসনিম জারা।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার হাফিজপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে। সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার মনমানসিকতা নিয়েই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে পূরণ হবে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য ঘিরে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন ডা. তাসনিম জারা। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন কীভাবে?
ডা. তাসনিম জারা বলেন, যদি মন্ত্রী বোঝাতে চান যে দেশে এত ডাক্তার তৈরি করা হবে যে মানুষকে আর দূরে যেতে হবে না, তাহলে চলুন বাস্তবতাটা দেখি। বাংলাদেশে এখন প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ৭ জন ডাক্তার আছেন। এটা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে আজ থেকেই মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রচুর শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হবে। কিন্তু এখানেই অসঙ্গতি।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী যদি আজকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, তাকে ৫ বছর ধরে পড়তে হবে, তারপর ১ বছর ইন্টার্নশিপ করতে হবে। কমপক্ষে ৬ থেকে সাড়ে ৬ বছর এখানেই যাবে। আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হতে হলে এর ওপরে আরও ৫ থেকে ৮ বছর লাগবে। মন্ত্রীর হাতে সময় আছে মাত্র ৫ বছর। তার মানে আজকে ভর্তি হওয়া কোনো শিক্ষার্থী এই সরকারের মেয়াদে ডাক্তার হয়ে একজন রোগীও দেখতে পারবেন না। ডাক্তার বাড়ানোর ফল পেতে হলে আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের পরিকল্পনা করতে হবে। সেই পরিকল্পনা কি মন্ত্রীর আছে? থাকলে সেটা স্পষ্ট করে জানান।
দ্বিতীয়ত তাসনিম জারা বলেন, যদি মন্ত্রীর উদ্দেশ্য হয় গ্রামে গ্রামে ডাক্তার পাঠানো এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া, তাহলে এটা সঠিক পথ এবং আমি এটি সমর্থন করি। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন কম নয়। আমাদের দেশে ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে থাকেন। অথচ প্রায় ৭৫ শতাংশ ডাক্তার শহরে। যুগের পর যুগ ধরে এই অবস্থা চলছে। কেন? একজন ডাক্তার ঢাকায় বসে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলে মাসে যা আয় করেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি চাকরি করলে তার থেকে অনেক কম উপার্জন করেন। গ্রামে সন্তানের জন্য ভালো স্কুল নেই, পেশাগত উন্নতির সুযোগ কম, দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ কম, নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে। এসব কারণে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদ অনুমোদিত থাকলেও সেই পদে ডাক্তার নেই।
‘তাহলে মন্ত্রী যদি সত্যিই ডাক্তারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চান, শুধু নির্দেশ দিলে হবে না। মানসম্পন্ন সরকারি বাসস্থান দিতে হবে, গ্রামে কাজ করলে পদোন্নতিতে সেটা বিবেচনায় নিতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে বিশেষ গ্রামীণ ভাতা দিতে হবে। শুধু ডাক্তার নয়, নার্স, মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, টেকনোলজিস্ট, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী সবার জন্য সুব্যবস্থা করতে হবে। এসব বাস্তবায়নের পথরেখা কী? সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী? কতদিন সময় লাগবে?’, যোগ করেন ডা. তাসনিম জারা।
তৃতীয়ত তিনি বলেন, আমরা ডাক্তার তৈরি করছি, কিন্তু সেই ডাক্তাররা থাকছেন না। প্রতি বছর বহু মেধাবী চিকিৎসক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, ভালো কর্মপরিবেশ, দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ, মানসম্মত বেতন ও নিরাপত্তার জন্য। এটা আমাদের সিস্টেমের ব্যর্থতা। এই ব্রেইন ড্রেইন ঠেকানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি মন্ত্রীর? না হলে এক হাতে তৈরি করে আরেক হাতে হারাতে থাকব।
চতুর্থত তিনি বলেন, মন্ত্রী তার নিজের নির্বাচনী এলাকায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দুটি আইসিইউ স্থাপনের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। দেশের প্রতিটি কোণে মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হোক, এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু একজন মন্ত্রী যখন নিজের এলাকার কথা আলাদা করে বলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এটা কি স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি মেটানোর তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক বিবেচনা? দেশে এমন অনেক জেলা ও উপজেলা আছে যেখানে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সুযোগ নেই, আইসিইউ তো দূরের কথা। জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় নরসিংদী কি সবার আগে ছিল?
ডা. তাসনিম জারা আরও বলেন, মন্ত্রী একটি সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ওনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কিভাবে করবেন, সেই পরিকল্পনা জানতে চাই। আমরা চাই এই সরকার স্বাস্থ্য খাতে সফল হোক। কারণ সফল হলে আমাদেরই কল্যাণ।
এমআই/টিকে