© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

‘জিরো থেকে হিরো’! উত্তম দাসের স্মৃতিচারণায় ছেলে বিবেক

শেয়ার করুন:
‘জিরো থেকে হিরো’! উত্তম দাসের স্মৃতিচারণায় ছেলে বিবেক

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৯:০০ পিএম | ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
”যিনি হাসান ও যাঁরা হাসেন তাঁদের আসলে স্বর্গে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ তাঁরা যেখানে থাকেন সেটাই স্বর্গ।” অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে একথা যিনি বলতেন তিনি উত্তম দাস। গত বৃহস্পতিবার তাঁর প্রয়াণ সংবাদে নস্ট্যালজিয়ায় ডুব দিয়েছেন অনেকেই। একসময় পাড়ার প্যান্ডেল থেকে ঘরোয়া অনুষ্ঠান ক্যাসেটে বেজে উঠত তাঁর কৌতুক! ফাংশানে তিনি ছিলেন এক ক্রাউডপুলার। আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো তিনি ততটা পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু গত শতকের আট-নয়ের দশকে যাঁরা দেখেছেন উত্তম দাসের ক্যারিশমা, তাঁরা জানেন।

তিনি বলছিলেন তাঁর ‘বাপি’র জনপ্রিয়তার কথা। বলছিলেন কীভাবে ভিড়কে নিয়ন্ত্রণ করতে জানতেন উত্তম। বলছিলেন কীভাবে প্রসেনজিৎ থেকে বলিউডের গোবিন্দা- তাবড় শিল্পীদের সঙ্গে মঞ্চ মাতিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু প্রথম কবে বুঝলেন আপনার বাবা খুব জনপ্রিয়? বিবেক বলছিলেন, ”তখন আমার ৬-৭ বছর। মনে পড়ছে, বাপির ফাংশান দেখতে গিয়েছি। ফার্স্ট রোয়ে বসে আছি। দেখি বাপিকে ধরার জন্য সবাই ছুটে আসছে! আমি তো অবাক। বাড়িতে যে ডাউন টু আর্থ লোকটাকে দেখছি, সেই লোকটার জন্য এত মানুষ পাগল! তাকে একবার ছোঁয়ার জন্য, অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য সে কী হইহই! দৃশ্যটা আমার মনের ভিতরে চিরকালের জন্য গেঁথে গিয়েছে।”

অথচ এমন জনপ্রিয় মানুষটার শুরু ছিল একেবারে শূন্য থেকে। বিবেকের কথায়, ”বাপি জিরো থেকে উঠেছে! আমাদের খড়দায় বাড়ি। শুরুর দিকে এখানকার মন্দিরে গান গাইত। সেটা সাতের দশক। হঠাৎই একদিন একজন এসে বলল, এই উত্তম, আমাদের অনুষ্ঠানে আজ অমুক আর্টিস্ট আসেনি। তুই একটু গেয়ে দে না। বাপি গাইল। লোকে শুনে বিস্মিত। বাহ! বেশ সুরে গায় তো। এই ভাবে শুরু হল ফাংশানে ঘুরে ঘুরে গান গাওয়া। সেই সঙ্গে কৌতুক নকশা। এভাবেই চলছিল স্ট্রাগল। এর মধ্যেই বাপি বিয়েও করে। দিদি ছিল বাপির লাকি চার্ম। দিদির জন্মের পরই ভাগ্য বদলাতে থাকে বাপির। বাবার প্রথম ক্যাসেট প্রকাশিত হয় সেই সময়। ১৯৮৬ সাল সেটা। এরপর পরপর ক্যাসেট বেরোতে থাকে। বাইশটা ভলিউম রয়েছে হাস্যকৌতুকের।

টি-সিরিজের সঙ্গেও বাবা কাজ করেছে। সেই সঙ্গে ছিল স্টেজ শো। সেটা জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বাবা করে গিয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ স্টেজ শো করেছে। সব মিলিয়ে দু’হাজারের উপর শো! বাবা জানত কীভাবে ক্রাউডটা কন্ট্রোল করা যায়। এমনও হয়েছে, আর্টিস্ট আসেনি। বাবা দেড়-দু’ঘণ্টা, এমনকী ঘণ্টা তিনেক একা শো চালিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এমনও হত, উদ্যোক্তারা ভয় পাচ্ছে আর্টিস্ট আসেনি। পাবলিক রেগে গিয়ে নির্ঘাত আগুন লাগিয়ে দেবে। কিন্তু কোথায় কী, উত্তম দাস একাই সব ম্যানেজ করে দিল। এমনও হয়েছে টানা পারফরম্যান্স করতে করতে গলা শুকিয়ে গিয়েছে… জলতেষ্টা পাচ্ছে… কিন্তু বাবা প্রোগ্রাম করে চলেছে! লোকে বলত, উত্তমদা আছে তো, ফাংশানে কোনও প্রবলেম হবে না। এতটাই ট্রাস্ট করত বাবাকে।”

দিদি ছিল বাপির লাকি চার্ম। দিদির জন্মের পরই ভাগ্য বদলাতে থাকে বাপির। বাবার প্রথম ক্যাসেট প্রকাশিত হয় সেই সময়। ১৯৮৬ সাল সেটা। এরপর পরপর ক্যাসেট বেরোতে থাকে।
অবধারিত ভাবেই এমন মানুষের ফ্যানের সংখ্যা ছিল অসংখ্য। তারা একবার উত্তম দাসের সঙ্গে দেখা করতে সটান বাড়িতে ছুটে আসত। বিবেক বলছেন, ”বাড়িতে ফ্যানরা ভিড় করত।

হয়তো রাত তিনটে নাগাদ বাড়ি ফিরেছে। সাতটা নাগাদ এক ভদ্রলোক হাজির। বলছেন, আমি বড় ফ্যান উত্তমদার। একবার একটু দেখা করব। বাবা কিন্তু দেখা করত। এমন ঘটনা অসংখ্য। এমনও হয়েছে লোকে দল বেঁধে এসেছে। বলছে, ফাংশানে উত্তমদা এসেছিল আমাদের পাড়ায়। তখন ছবি তোলা হয়নি। আজ আমরা সবাই এসেছি। একটা ছবি তুলবই। আবার বাবা প্রোগ্রাম করে বেরিয়ে যাবে, লোকজন মাটিতে বসে পড়েছে। খেয়ে যেতে হবে। বাবা নাছোড়বান্দা। বাড়িতে গিয়েই খাবে। লোকেও ছাড়বে না। বলছে, আমাদের পাড়ার মেয়ে-বউরা মিলে রান্না করেছে। উত্তমদা তুমি খেয়ে না গেলে আমরা শান্তি পাব না। বাপি কিন্তু শেষে হার মানত। আসলে ফ্যানদের কথা বাবা ফেলতে পারত না। ফ্যানরাও তাই বাবাকে খুব ভালোবাসত।”

উত্তমকে ভালোবাসতেন তারকারাও। সে টলিউড হোক বা বলিউড। বৃহস্পতিবার সকালে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সোশাল মিডিয়ায় আবেগঘন পোস্ট করেছেন উত্তম দাসকে নিয়ে। সেপ্রসঙ্গ উঠতে বিবেক বললেন, ”বুম্বাদা আমার বাপিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। বাবাও খুব ভালোবাসত। দু’জনের সম্পর্কটাই অন্যরকম ছিল। বুম্বাদার ফাংশানে উত্তম দাসকে থাকতেই হবে! কেবল বুম্বাদা কেন, বলিউডের হিরো গোবিন্দার সঙ্গেও বাবা প্রোগ্রাম করেছে। সোনু নিগমের সঙ্গেও। আমি সেদিনই একটা ভিডিওয় দেখছিলাম সোনুজি স্মৃতিচারণ করছেন বাবাকে নিয়ে। বিনোদ রাঠোরের সঙ্গেও করেছে। এখানে জিৎদা-দেবদা… ঋতুপর্ণাদি… কে নয়? ঋতুপর্ণাদির সঙ্গে প্রোগ্রাম করতে সিঙ্গাপুরেও গিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে দেখেছি তারকা ও উদ্যোক্তাদের ভিড়। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, তরুণ কুমার আরও অনেকেই এসেছেন এই বাড়িতে। গৃহপ্রবেশে এসেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। মা একটা দোকান করেছিল খড়দাতেই। উদ্বোধন করেছিলেন চিরঞ্জিৎ, শতাব্দী রায়।”

কিন্তু এত তারকা সান্নিধ্যেও বাড়িতে একজন সাধারণ গৃহস্থের মতোই কাটাতেন উত্তম দাস। বিবেক জানাচ্ছেন, ”সকালে উঠেই পুজো করতে বসে যেত। মোটামুটি পৌনে একঘণ্টা থাকত সেখানেই। আমাদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তি রয়েছে। বাপি রোজ মা-কে একটি ফুল নিবেদন করত। কিশোরকুমারের গান শুনত। একেকদিন গান চালিয়ে অনেকক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকত। আবার বাড়িতে সবাইকে হাসাতে খুব ভালোবাসত বাপি।”

যেদিন বিবেকের জন্মদিন, সেদিনই মৃত্যু হয় উত্তম দাসের। বলতে গিয়ে বাষ্প ভেসে ওঠে কণ্ঠস্বরে, ”১৯৯৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আমার জন্ম। আর ২০২৬ সালের ওই দিনই আমার পিতৃবিয়োগ হল। এটা কি কখনও ভুলতে পারব?” বিষণ্ণ মনে ভিড় করে আসে স্মৃতিরা, ”বাবা বলত সব মানুষের গলায় একটা সুর থাকে, বিবেক। তুমি যখন কথা বলবে, তোমার সেই কথার ভিতরে যেন মানুষ একটা সুর টের পায়। বাবা এটাকে মেন্টেন করত। সেই সুরটাই ছন্দে বেঁধে রাখত সবটা। কোথা দিয়ে সময় চলে যেত লোকে বুঝতে পারত না। আসলে ছোটবেলা থেকেই রসস্নিগ্ধ একটা মন ছিল। বাপি বলত, যত হাসবে লিভার তত ভালো থাকবে। মন ভালো থাকবে। দিনে যদি দু’টো মানুষকেও হাসাতে পারি, মনে করব আমার দিনটা আজ সার্থক। কারও মুখ গম্ভীর দেখলে যতক্ষণ না সেই মুখে হাসি ফোটাতে পারছে, বাপি স্বস্তি পেত না। বাপি যে ঘরে থাকত, সেই ঘরে সব সময় হাসির রোল। রক্তের মধ্যে হাসি মিশে থাকত বাপির।” উত্তম দাস চলে গিয়েছেন। থেকে গিয়েছে তাঁর হাসির রেশ। কেবল অপত্যের হৃদয়ে নয়, অসংখ্য ভক্তের স্মৃতিতেও।

বাপি বলত, যত হাসবে লিভার তত ভালো থাকবে। মন ভালো থাকবে। দিনে যদি দু’টো মানুষকেও হাসাতে পারি, মনে করব আমার দিনটা আজ সার্থক।

মন্তব্য করুন