ঋণের পরবর্তী কিস্তি নিয়ে মার্চে নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে আইএমএফ দল
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪৮ এএম | ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল আগামী মাসে ঢাকায় আসছে। এর ফলে, বহু মিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি সচল রাখা এবং বিলম্বিত ১.৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের আশা করছে বাংলাদেশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৯-১০ মার্চ তিন সদস্যের একটি আইএমএফ দল ঢাকা সফরে আসবে। দলটির নেতৃত্ব দেবেন সংস্থাটির এশিয়া-প্যাসিফিক ডিপার্টমেন্টের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন।
গত ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফ একটি কিস্তি ছাড় স্থগিত রাখে। সংস্থাটি জানায়, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী অর্থ ছাড় করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে এবং বিএনপি সরকার শর্ত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলে আগামী জুনের মধ্যে ১.৩০ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যেতে পারে। এতে ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তি ও পরবর্তী নির্ধারিত কিস্তি একসঙ্গে ছাড় হবে।
কর্মকর্তারা বলেন, রাজস্ব আহরণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার এই সময়ে অর্থ ছাড় সরকারের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
আইএমএফের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চিঠি দিয়েছে। এতে ৯ অথবা ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর এক ঘণ্টার বৈঠকের স্লট বরাদ্দের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারির চিঠিতে ইআরডি বলেছে, আইএমএফ এর ঋণ কর্মসূচির আওতায় গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা, সফল বাস্তবায়ন মূল্যায়ন এবং নতুন সরকারের সঙ্গে অব্যাহত সহযোগিতা পুনর্ব্যক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রাসহ আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত এখনো পূরণ হয়নি।
অপেক্ষমাণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু।
তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ও সরকার গঠনের পর অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইকোনমিক রিফর্ম কমিশন (অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন) গঠন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী করা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার অব্যাহত রাখা।
আইএমএফের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ভর্তুকি কমানো ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণ। নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে ভর্তুকি যৌক্তিক করার উপায় খুঁজতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে বলে গভর্নরকে আশ্বস্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'বিএনপি ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে আইএমএফের অনেক শর্তই পূরণ হবে। সে বিবেচনায় কর্মসূচি সচল রাখতে সরকার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে অপেক্ষা করছে।'
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি
কোভিড মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করে।
ঋণ কর্মসূচির শর্তের মধ্যে ছিল- রাজস্ব খাত সংস্কার, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন ও ভর্তুকি কমানো। পরে গত বছরের জুনে আইএমএফ কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার যুক্ত করে। এতে মোট ঋণ প্যাকেজ দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, একই বছরের ডিসেম্বরে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০২৪ সালের জুনে ১.১৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের জুনে ১.৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়। ফলে এখনো ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার বাকি রয়েছে।
গত ডিসেম্বর আরেকটি কিস্তি ছাড়ের কথা থাকলেও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা না হওয়ায় আইএমএফ তা স্থগিত রাখে।
গত অক্টোবরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সংস্থাটি তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে জানায়, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী অর্থ ছাড় করা হবে।
কিস্তি ছাড় না করার সিদ্ধান্তের পর নভেম্বরে সালেহউদ্দিন বলেন, নির্বাচিত সরকার কত ঋণ সহায়তা চাইবে, তা নিয়েও আইএমএফ আলোচনা করবে।
সফর নিয়ে অর্থনীতিবিদদের ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, এই সফর আইএমএফের আগের অবস্থানেরই প্রতিফলন, যেখানে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার পুনরায় জারি করেনি এবং এনবিআর বিভক্তির কাজও অসম্পূর্ণ রয়েছে।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিময় হার বাজারভিত্তিক বললেও যেভাবে বাজার থেকে ডলার কিনছে, তা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন আছে। এটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর মাধ্যমে বাজারে ৬৫,০০০ কোটি টাকা প্রবেশ করেছে।'
তার মতে, আলোচনায় আইএমএফ এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকার দেখাতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আইএমএফের অধিকাংশ সংস্কার দাবি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে তিনি বলেন, গত জানুয়ারিতে আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণ স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ জানালেও এ বিষয়ে বিএনপির ইশতেহারে বিস্তারিত নেই।
তার মতে, আইএমএফের শর্তে ব্যাংক খাত সংস্কারই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা ব্যক্তি গ্রাহক নাকি প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহক পর্যায়ে দেওয়া হবে-স্পষ্ট নয়।
আইএমএফ বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিক স্বাধীনতা চেয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করার প্রস্তাব এ চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। কারণ, এর সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য ও রপ্তানি প্রণোদনা জড়িত।
তৌফিকুল বলেন, 'আইএমএফ প্রতিটি কিস্তিতে খুব বড় অঙ্ক দেয় না। তবে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর বাজেট সহায়তা সাধারণত আইএমএফ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকে। কর্মসূচি চলমান থাকলে অন্যরাও ঋণে আগ্রহী হয়।'
তিনি আরও বলেন, আইএমএফের অনেক সংস্কার দেশের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সরকারের উচিত আইএমএফের কারিগরি সহায়তা নিয়ে দেশের বাস্তবতায় এসব সংস্কার কার্যকর করা।
কেএন/এসএন