© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

প্রাচীন সভ্যতায় যেমন ছিল রোজার সংস্কৃতি

শেয়ার করুন:
প্রাচীন সভ্যতায় যেমন ছিল রোজার সংস্কৃতি

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৮:৫৫ এএম | ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ইসলামের আবির্ভাবের হাজার বছর আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতা ও ধর্মে প্রচলিত ছিল উপবাস বা রোজা। আত্মশুদ্ধি, দেবতাদের সন্তুষ্টি কিংবা পাপ মোচনের উপায় হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পালিত হতো এই প্রাচীন রীতি।

রমজান মাসে মুসলিম উম্মাহ মাসব্যাপী রোজা পালন করেন, যা ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, রোজার ধারণাটি কেবল ইসলামের সাথেই যুক্ত নয়; বরং প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে নীল নদের উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই কৃচ্ছ্রসাধনের সংস্কৃতি। 

সম্প্রতি বিবিসি আরবি বিভাগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই রোজা ও উপবাসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই চলুন এবারে জেনে নেওয়া যাক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় কেমন ছিল রোজার সংস্কৃতি।

প্রাচীন মিশর: দেবতাদের তুষ্টি ও আত্মশুদ্ধি

নীল নদ কেন্দ্রিক প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় উপবাস ছিল যাপিত জীবনের অংশ। ফেরাউনদের আমলে মিশরীয়রা দেবতাদের নৈকট্য অর্জন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য রোজা রাখতেন। বিশেষ করে বসন্ত উৎসব, ফসল কাটা এবং নীল নদের প্লাবন উৎসবের সময় তারা উপবাস পালন করতেন।

গবেষকদের মতে, তাদের এই উপবাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী হতো। কখনো কখনো এর মেয়াদ ৩ দিন থেকে শুরু করে ৭০ দিন পর্যন্ত হতো। এ সময় তারা খাদ্য, পানীয় ও শারীরিক যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতেন। তবে এই উপবাস কি কেবল পুরোহিতদের জন্য ছিল নাকি সাধারণ মানুষের জন্য—তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।

পারস্য ও ইয়াজিদি ধর্ম: বিচিত্র বিশ্বাস

খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে পারস্য অঞ্চলে জরথুস্ত্রবাদের প্রাধান্য ছিল। মজার বিষয় হলো, জরথুস্ত্রবাদে উপবাসকে নিরুৎসাহিত করা হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, না খেয়ে থাকলে শরীরের শক্তি কমে যায়, যা সমাজ গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তবে কুর্দি অধ্যুষিত ইয়াজিদি ধর্মে তিন দিনের রোজা রাখার প্রচলন ছিল। তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই রোজা চলত। সাধারণ মানুষের বাইরে ধর্মযাজকদের জন্য ছিল বিশেষ দীর্ঘমেয়াদী রোজা। এমনকি 'সাওম খুদান' নামে এক বিশেষ রোজা সাধু-সন্ন্যাসীরা পালন করতেন এবং দীর্ঘ সময় রোজা রাখা ছিল তাদের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

ইহুদি ধর্ম: ইয়োম কিপুর ও প্রায়শ্চিত্ত

আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম ইহুদি ধর্মে 'ইয়োম কিপুর' বা প্রায়শ্চিত্তের দিনে উপবাস রাখা বাধ্যতামূলক। এটি তাদের সবচেয়ে পবিত্র দিন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই নবী মুসা (আ.) দ্বিতীয়বার সিনাই পর্বত থেকে তাওরাতের ফলক নিয়ে অবতরণ করেছিলেন।

ইহুদিদের এই রোজা টানা ২৬ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও আত্ম-সমালোচনার উদ্দেশ্যে তারা এই সময় সব ধরনের পার্থিব ভোগ-বিলাস ত্যাগ করেন। তবে অসুস্থ বা গর্ভবতী নারীদের জন্য এই নিয়মে শিথিলতা রয়েছে।

খ্রিষ্টধর্ম: আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইস্টার

খ্রিষ্টধর্মে উপবাসকে দেখা হয় ঈশ্বরের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন হিসেবে। বাইবেলে রোজার নির্দিষ্ট কোনো মাস উল্লেখ না থাকলেও বিভিন্ন চার্চ বা সম্প্রদায় নিজস্ব রীতিতে এটি পালন করে। বিশেষ করে ইস্টারের আগে ৪০ দিনের উপবাস খ্রিষ্টানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দানিয়েল নবীর বর্ণনা অনুযায়ী, তারা প্রার্থনা ও বিনয়ের সাথে ছাই ও শোকবস্ত্র পরিধান করে উপবাস পালন করতেন। বর্তমান সময়ে খ্রিষ্টানরা সাধারণত দিনে অন্তত ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থেকে এই আধ্যাত্মিক সাধনা করেন।

সভ্যতার বিবর্তনে রোজার ধরণ ও পালনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও এর মূল সুরটি সবসময় একই ছিল আত্মশুদ্ধি এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ। প্রাচীন মিশরীয়দের নীল নদের উৎসব থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের রমজান, রোজা সবসময়ই মানব সভ্যতায় সংযম ও ধৈর্যের মহান এক প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।

এসএস/এসএন

মন্তব্য করুন