© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

পৃথিবী যে কারণে স্মরণ করবে ‘সুইডেন মডেল’

শেয়ার করুন:
পৃথিবী যে কারণে স্মরণ করবে ‘সুইডেন মডেল’
international-desk
০৬:০১ পিএম | ০৬ মে, ২০২০

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিশ্বের সব দেশই লকডাউনের পন্থা অবলম্বন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে আফ্রিকার বতসোয়ানা পর্যন্ত লকডাউনেই খুঁজেছে করোনা মুক্তির পথ। আবার অনেক দেশ ভিন্ন ভিন্ন নামে পুরো দেশ অচল রেখেছেন, যা মুলত লকডাউনেরই অঘোষিত রুপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের প্রকোপ থামাতে লকডাউন জোরদারের পরামর্শ দিয়ে আসছে। লকডাউন মেনে অনেক দেশ করোনা মোকাবিলায় সফলও হয়েছে। যেমন ধরুন- নিউজিল্যান্ড।

কিন্তু লকডাউনের গতানুগতিক পথে না হেটে পৃথিবীর একমাত্র দেশ সুইডেন একলা চলো নীতি নিয়ে করোনা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। করোনার সংক্রমণ রোধে সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করা, নাগরিকদের সচেতন করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেই জোর দিয়ে আসছে দেশটি। আর এসব মেনেই সুইডেন এখন করোনা নিয়ন্ত্রণে সফলতার পথে।

করোনা নিয়ন্ত্রণে সুইডেনের গৃহিত ব্যতিক্রমী বেশ কয়েকটি সাহসী উদ্যোগ নিয়ে লিখেছেন পার্থ প্রতিম বসু। তিনি সুইডেনে বসবাস করেন। সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এ্যান্ড হসপিটালে সিনিয়র রিসার্চার হিসেবে কাজ করেন মি. বসু।

পার্থ প্রতিম বসু লিখেছেন- মহামারী শুরু হওয়া থেকে সুইডিশ পার্লামেন্ট কোভিড-১৯ বিষয়ক নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা দেশটির ‘নিলস্ অ্যান্ডারসন টেগনেল’ নামে এক বিশিষ্ট মহামারী বিশারদের হাতে দেয়। এরপর থেকে নিলস অ্যান্ডারসন টেগনেল টানা তিন মাস ধরে করোনা বিষয়ে সুইডিশ সরকারকে নানা সুপারিশ ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছেন। কিন্তু এই তিন মাসে সুইডেনের বিরোধী দল বা সমালোচকরা কেউই নিলস অ্যান্ডারসনের পরামর্শের বিরোধিতা করেনি। এমনকি সরকারও অ্যান্ডারসনের পরামর্শের বাইরে একটা সিদ্ধান্তও নেয়নি।

প্রতি দিন দুপুরে নিয়ম করে প্রেস মিটিং করেন নিলস অ্যান্ডারসন টেগনেম। সুইডেনের করোনা পরিস্থিতি, কি করা উচিত, কি করা অনুচিত সব বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন মি. অ্যান্ডারসন। তার এই সুপারিশ ও বক্তব্যগুলো সুইডেনের সরকারি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। আজ পর্যন্ত তার ওই বিবৃতির বিরোধীতা কেউ করেছে বলে শুনিনি।

সুইডেন করোনা সংক্রমণ রোধে প্রথম যে কাজটি করেছে তাহল, তারা ভাইরাসে সংক্রমণের গড় প্রতিলিপি তৈরি করেছে। যেখানে করোনার গড় প্রতিলিপি দেখানো হয়েছে ২ থেকে ২.৫, যা সাধারণ ফ্লুর ক্ষেত্রে ১.৫ এবং হামের ক্ষেত্রে তা দশমিক ১৫। (উল্লেখ্য, প্রতিলিপি সংখ্যা হল, যত জন মানুষ সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে একজন ভাইরাসবাহক দ্বারা আক্রান্ত হন।)

অতএব, সংক্রমণের শুরুতেই একটি বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত সত্যটি সুইডেন মেনে নেয়। আর তা হল, নভেল করোনা ভাইরাসের মতো একটি আরএনএ ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীতে তার প্রতিকূল ফলাফল বিশ্লেষণ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। কাজেই এই সময়ের মধ্যে দেশের কমপক্ষে ৬০-৭০ শতাংশ মানুষের সংক্রমণ হতে পারে কোনও লকডাউন ছাড়াই।

সামাজিক দুরত্ব ও হাত ধোয়ার ব্যাপক প্রয়োগ- অন্য দিকে সামাজিক দূরত্ব ও হাত ধোয়ার মতো কতগুলি স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপক প্রয়োগ, করোনা সংক্রমণের হারে রাশ টানতে পারে বলে মনে করেছে সুইডেন।

দেশটি বিশ্বাস করেছে, দীর্ঘ লকডাউনের আর্থ-সামাজিক ভার, কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধকেই মন্থর করে দেবে। কাজেই লকডাউন না করে যদি জনগনের সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করা যায়, তবে সেটিই বেশি কার্যকর হবে।

সুইডেনের সরকার মনে করেছে, যারা করোনা আক্রান্তের ঝুঁকির মধ্যে সম্ভাব্য্য। তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করা বা আইসোলেট করাই উত্তম। এভাবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাপও তেমন তৈরি হবে না।

গুরুতর রোগে আক্রান্তদের পৃথককরণ- সুইডেন তার জনগনকে বিভিন্ন রিস্ক গ্রুপে ভাগ করে নেয়। যেমন- বয়স ৬৫-র উর্দ্ধে, ডায়াবিটিক, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুস ও কিডনির সমস্যায় ভুগতে থাকা মানুষজনকে গ্রুপ ভিত্তিক আলাদা করা হয়েছে। এধরণের গ্রুপভুক্ত নাগরিকদের সামাজিক দুরত্ব সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

এমনকি গত ইস্টার সানডে উদযাপনের সময়ও দেশটির শিশুদের থেকে তাদের দাদা-দাদি ও পরিবারের বয়স্কদের দুরে রাখা হয়েছে। আর সামর্থ্যবান ও মধ্য বয়স্ক বাকিরা যেন অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব ও তাদের হাত পরিষ্কার রাখে সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

সেই সঙ্গে যদি কোন ব্যক্তির শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দেয়, তিনি যেন হাসপাতালে ভীড় না করে জরুরি সেবার হটলাইনে যোগাযোগ করেন, সেই পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কারণ সুইডেন মনে করেছে, আক্রান্ত ব্যক্তি হাসপাতালে আসলে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

এছাড়া দেশটির শপিং মল, খাবারের দোকান, ফার্মেসী ও প্রয়োজনীয় দোকানগুলোতে আগত মানুষদের সামাজিক দুরত্ব কঠোর ভাবে মান্য করা হচ্ছে। নাগরিকরা নিজ নিজ জায়গা থেকেই দারুন সচেতন ও সতর্ক। পরিবারের সুস্থ ও ধকল সইবার মত সদস্যরাই কেবল জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাচ্ছেন। আর বাকিরা ঘরেই থাকছেন।

স্কুল-কলেজে পাঠদান অব্যাহত- সুইডেন তার দেশের স্কুল, কলেজ ও ইউনিভর্সিটির পঠনপাঠন ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় চালিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত সুইডেনে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করাও হয়নি। কারণ, গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে, ১৫ বছরের কমবয়সীদের সংক্রমণ-পরবর্তী জটিলতা প্রায় নেই। এছাড়া বাচ্চারা যদি স্কুলে না যায়, তাহলে তাদের বাবা-মা অফিসে যাবে কিভাবে? কারণ তারা তো বাচ্চাদের বাসায় রেখে বাইরে যেতে চান না। তারা চান, বাচ্চারা স্কুলে শিক্ষকদের তত্বাবধানে থাকুক, আর এই সময়ের মাঝে তারা তাদের কাজ সেরে আসবেন।

এভাবেই করোনাভাইরাসের মহামারী রুখতে বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপকে সামনে এনেছে সুইডেন। তারা লকডাউনের পথে হাটেনি। কারণ দেশটি প্রমাণ করতে চেয়েছে, লকডাউন পৃথিবীর সময়কে বেধে রাখতে পারেনি। কারণ পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষেরা একদিন লকডাউন ভেঙ্গে দেবেই। বিজ্ঞানের ভিত্তিতে পরিচর্যা ও সামাজিক আচার-আচরণে পরিমার্জন করে জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতেই হবে। আর ঠিক এ কারনেই সুইডেন বিজ্ঞানমনস্ক সামাজিক রীতিনীতি ও জনস্বাস্থ্যনীতি কার্যকর করতে চেয়েছে, লকডাউন নয়।

 

টাইমস/এসএন

মন্তব্য করুন