দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভারসাম্য কূটনীতি
ছবি: সংগৃহীত
১২:০৩ এএম | ০৫ মার্চ, ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি বর্তমানে এক জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে এখন বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তার মূল ভিত্তি হলো- জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কৌশলগত ভারসাম্য।
এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল শক্তির রাজনীতিতে এটি নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা।
ত্রিমুখী শক্তির টানাপোড়েনে বাংলাদেশ:
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ভূ-কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত এই তিন শক্তির স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে স্বার্থের দ্বন্দ্বে লিপ্ত। বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক সংযোগ, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন আর কোনো প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত নোড।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে। কিন্তু ওয়াশিংটন গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রমমানকে সামনে রেখে ক্রমেই চীন-বিরোধী অবস্থানকে জোরালো করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে এই চাপ সামাল দেওয়াও ঢাকার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো খাতে প্রধান বিনিয়োগকারী। বন্দর, বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ প্রকল্পে চীনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে একই সঙ্গে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে, যা নতুন সরকারের জন্য সতর্কতার বিষয়।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক- সংযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা থাকলেও পানিবণ্টন, সীমান্ত ইস্যু এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে সংবেদনশীলতা এখনো কাটেনি। ফলে নতুন সরকারের জন্য দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কেও ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার রয়েছে। একইভাবে, সার্কের পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি তুরস্ক এবং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
'প্রো-বাংলাদেশ' নীতি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি:
এই বাস্তবতায় সরকার যে “প্রো-বাংলাদেশ” নীতির কথা বলছে, তার অর্থ কোনো পরাশক্তির বলয়ে ঢুকে পড়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতির সক্রিয় ব্যবহার, সার্ক ও আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক ফোরাম পুনরুজ্জীবিত করা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই নীতির মূল লক্ষ্য।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার
এই পররাষ্ট্রনীতির ধারা ঐতিহাসিকভাবেও নতুন নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭–৮১ সময়কালে “বাংলাদেশ প্রথম” নীতির মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতির যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি ভারত-সোভিয়েতকেন্দ্রিক একক বলয় থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
বর্তমান সরকার যদি সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাস্তববাদী কিন্তু বহুমুখী কূটনীতির পথে অগ্রসর হয়, তাহলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি স্বায়ত্তশাসিত, আত্মবিশ্বাসী ও সম্মানিত শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবে।
টকশোর তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্কোরিংয়ের বাইরে এসে নীতি ও কৌশলের ভিত্তিতে আলোচনা করাই এখন সময়ের দাবি। আমেরিকা-চীন-ভারতের তীব্র কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দরকার দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ কূটনীতিক—এবং এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তকে অনেকে দূরদর্শী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতিনির্ধারণে নতুন গতি আনতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমান-এর দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তা-বিষয়ক দক্ষতা বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামা ওবায়েদ-এর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে হুমায়ুন কবির-এর নীতিনির্ধারণী ভূমিকা মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা বাড়াবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও সমন্বিত উদ্যোগ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে আরও কৌশলগতভাবে প্রস্তুত করবে-এমন প্রত্যাশাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
লেখক: ড. এম মুজিবুর রহমান
সংবাদ বিশ্লেষক, সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
কো-কনভেনর, সাস্ট এলামনাই এসোসিয়েশন।
পিএইচডি (ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টল),
পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো (ইউনিভার্সিটি অব বাথ এবং ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম)।
এমআর/টিএ