© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

বিশেষ অনুসন্ধান / মার্কিন আদালত দণ্ড দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মনসুরকে

শেয়ার করুন:
মার্কিন আদালত দণ্ড দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মনসুরকে

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৫:১০ পিএম | ০৬ মার্চ, ২০২৬
বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার এবং আর্থিক খাতের দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা দূর করার কঠিন প্রত্যয় নিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাল ধরেছিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে ভিন্ন কথা। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত তাঁকে ‘আর্থিক অব্যবস্থাপনা’ এবং ‘চুক্তি ভঙ্গ’ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছিলেন, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে দেশের একটি গণমাধ্যমের কাছে।

মার্কিন আদালতে আর্থিক দণ্ড ও ‘মেকানিক’স লিয়েন’ : অনুসন্ধানে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে মেরিল্যান্ডে বসবাসকালে আহসান এইচ মনসুর এবং তাঁর তৎকালীন স্ত্রী সায়রা মনসুর একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ না করে আর্থিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

১৯৯৪ সালের ২১ অক্টোবর মন্টগোমারি কাউন্টি সার্কিট কোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘আলবার্ট মার্টিন গেটস জুনিয়র (গেটস কনস্ট্রাকশন)’ মামলা দায়ের করে। আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে ড. মনসুরকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং ১৯৯৪ সালের ২০ ডিসেম্বর ৫ হাজার ৫২৯ ডলারের আর্থিক জরিমানা ও মেকানিক’স লিয়েন প্রদানের নির্দেশ দেন। কোনো সম্পদ নির্মাণ বা মেরামতের পর অর্থ পরিশোধ না করলে আদালত সাধারণত এ ধরনের ‘লিয়েন’ বা সাজা প্রদান করেন।

ওয়ান্টেড গভর্নও : ওয়াশিংটনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার লজ্জা : আহসান এইচ মনসুরের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ঘটে ২০২৪ সালের অক্টোবরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সভায় যোগ দিতে ওয়াশিংটন গিয়ে ড. মনসুর চরম অপদস্থ হন। ১৯৯৭ সালে ‘স্মিথ কোজেনারেশন’ নামক একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের জেরে আদালত অবমাননার দায়ে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ড. মনসুর এবং সাবেক অর্থ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মার্কিন মার্শাল সার্ভিসকে তাঁদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

আইএমএফ পেনশন ও পারিবারিক বিচ্ছেদের আর্থিক গোলকধাঁধা: ড. মনসুরের ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনেও অস্বচ্ছতার ছাপ পাওয়া গেছে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের নথিপত্রে।

২০০৯ সালে স্ত্রী সায়রা সারওয়ার যখন বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন, তখন অভিযোগে বলা হয়েছিল ড. মনসুর তাঁকে এবং তাঁদের সন্তানদের কোনো প্রকার আর্থিক সহায়তা না দিয়ে ‘পরিত্যাগ’ (অনধহফড়হ) করেছেন। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার সময় দেখা যায়, ড. মনসুর তাঁর আইএমএফের ২ মিলিয়ন ডলারের পেনশন ফান্ডের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি টাকা) এককালীন পরিশোধ করতে বাধ্য হন।

দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় ও স্বার্থের সংঘাত : গভর্নর হওয়ার আগ পর্যন্ত ড. মনসুর ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ওয়ালটনের মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন।

২০২২ সালে শুধু ব্র্যাক ব্যাংক থেকেই তিনি বেতন ও বোনাস বাবদ ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি ঢাকার গুলশানে বিলাসবহুল বাড়ি এবং সাভারের কাছে উচ্চবিত্তদের উপযোগী বিশাল ‘ফার্মহাউস’ তাঁর জীবনযাত্রার আভিজাত্যই ফুটিয়ে তোলে।

প্রশ্ন উঠেছে, যিনি নিজে বড় বড় করপোরেট হাউসের বেতনভোগী ছিলেন এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে পাওনা পরিশোধ না করার মামলা হয়েছে, তিনি কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন?

নৈতিকতার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ কেন্দ্রীয় ব্যাংক : আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এমন একটি পদ যেখানে ব্যক্তিগত সততা (ওহঃবমৎরঃু) প্রশ্নাতীত হতে হয়। কিন্তু ড. মনসুরের ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি আর্থিক জরিমানার সম্মুখীন হয়েছেন, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ না দেওয়ায় আদালতের ভর্ৎসনা শুনেছেন এবং সবশেষে আন্তর্জাতিক একটি ব্যবসায়িক চুক্তির জেরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে পড়েছেন।

দেশের সাধারণ মানুষ যখন মূল্যস্ফীতির ভারে পিষ্ট এবং ব্যাংকগুলো যখন তারল্যসংকটে ধুঁকছে, তখন একজন ‘দণ্ডিত’ ও ‘বিতর্কিত’ অর্থনীতিবিদ কীভাবে বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটাই একটি বিস্ময়কর ঘটনা।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
এসএস/এসএন

মন্তব্য করুন