© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

কাদেরকে দিয়ে কিয়ামতের ময়দানে শুরু হবে বিচার?

শেয়ার করুন:
কাদেরকে দিয়ে কিয়ামতের ময়দানে শুরু হবে বিচার?

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৯:০৪ এএম | ০৭ মার্চ, ২০২৬
অনেক ক্ষেত্রে মানুষ সাফল্যের সংজ্ঞা যে রকম করে কল্পনা করে মহান আল্লাহর দরবারে তার মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমও হতে পারে। দুনিয়ার জীবনে কেউ বীর, কেউ আলেম, কেউ দানবীর। সমাজ তাদের সম্মানের আসনে বসায়, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে যখন বিচার হবে অন্তরের নিয়ত অনুযায়ী, সেখানে বাহ্যিক অর্জন প্রসিদ্ধি নয়, বরং অন্তরের উদ্দেশ্যই হবে আসল মানদণ্ড।

এই গভীর সত্যটিই আমাদের সামনে উন্মোচন করে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হৃদয়বিদারক হাদিস।

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিল। তাকে আল্লাহ তাঁর নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে সেগুলো স্বীকার করবে।

তখন জিজ্ঞেস করা হবে, ‘তুমি এসবের বিনিময়ে কী করেছ?’ সে বলবে, ‘আমি আপনার পথে যুদ্ধ করেছি, এমনকি শহীদ হয়েছি।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি যুদ্ধ করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে বীর বলে।’ এরপর বলা হবে, ‘তোমাকে তো দুনিয়ায় তাই বলা হয়েছে।’ অতঃপর তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম, হাদিস : ১৯০৫)

এরপর আনা হবে সেই ব্যক্তিকে, যে ইলম অর্জন করেছে, মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কোরআন তিলাওয়াত করেছে। তাকেও আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে বলবে, ‘আমি ইলম শিখেছি, শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কোরআন তিলাওয়াত করেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি ইলম অর্জন করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে বড় আলেম বলে, কারি বলে।’ তারপর বলা হবে, ‘তোমাকে তা-ই বলা হয়েছে।’ এরপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হবে।

তারপর আনা হবে সেই সম্পদশালী ব্যক্তিকে, যাকে আল্লাহ বিপুল ধনসম্পদ দিয়েছিলেন। সে বলবে, ‘আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য দান করেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি দান করেছিলে যেন মানুষ তোমাকে দানবীর বলে।’ ঘোষণা করা হবে, ‘তোমাকে দুনিয়ায় তাই বলা হয়েছে।’ অতঃপর তাকেও টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামে নেওয়া হবে।

এই হাদিস আমাদের সামনে যে সত্যটি স্পষ্ট করে, তা হলো নিয়তই আমলের প্রাণ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তো শুধু এই নির্দেশই পেয়েছিল যে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে একনিষ্ঠভাবে, তাঁর জন্য দ্বিনকে খাঁটি করে।’ (সুরা : বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫)

বাহ্যিকভাবে মহৎ আর মহান দেখানো আমলও যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শিরককে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘তা হলো রিয়া।’ (মুসনাদ আহমদ)

অর্থাৎ মানুষকে দেখানোর জন্য ইবাদত করা। এই রিয়া এমন এক সূক্ষ্ম ব্যাধি, যা নেক আমলকে ভেতর থেকে নষ্ট করে দেয়।

তবে এখানে একটি আকিদাগত বিষয় মনে রাখা জরুরি। হাদিসে যাদের কথা এসেছে, তারা ঈমানদার হয়েও নিয়ত নষ্ট করার কারণে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু যদি কেউ অন্তরে ঈমান রাখে, তবে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে- এ কথা সরাসরি এই হাদিসে বলা হয়নি। চিরস্থায়ী জাহান্নাম মূলত কুফর ও শিরকের জন্য নির্ধারিত। তাই এ হাদিস ভয়াবহ সতর্কবার্তা হলেও তা আকিদার আলোকে বুঝতে হবে।

আজকের সমাজে সাফল্য মানে খ্যাতি, অনুসারী, প্রচার ও বাহবা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে আমলও অনেক সময় প্রদর্শনের বস্তু হয়ে যায়। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে কোনো অনুসারী, কোনো তালি, কোনো সংবাদ শিরোনাম কাজে আসবে না। সেখানে শুধু একটি প্রশ্নই মুখ্য হবে; আমি কার জন্য কাজটি করেছি?

এই হাদিস আমাদের আমলের ধরন বদলাতে শেখায় না; বরং আমলের ভেতরের উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করতে শেখায়। শহীদ হওয়া মহৎ, ইলম শিক্ষা দেওয়া মহৎ, দান করা মহৎ। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে বিষয়টি পরিণতি নির্ধারণ করবে, তা হলো একনিষ্ঠতা। আল্লাহর সন্তুষ্টি যদি লক্ষ্য হয়, তবে ছোট আমলও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। আর মানুষকে খুশি করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে বড় আমলও শূন্য থেকে যায়।

কিয়ামতের সেই কঠিন দিনের আগে আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমি যা করছি, তা কি সত্যিই আল্লাহর জন্য? নাকি মানুষের চোখে বড় হওয়ার জন্য? এই প্রশ্নের সৎ উত্তরই আমাদের আখিরাত নির্ধারণ করবে।

এসকে/টিএ

মন্তব্য করুন