চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রামে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করে মসজিদ কমিটির নোটিশ
ছবি: সংগৃহীত
০৬:০১ এএম | ০৮ মার্চ, ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলভুক্ত তেররশিয়া পোড়াগ্রামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে গানবাজনা হলে আলেমদের পক্ষ থেকে বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণাও দেয়া হয়। তবে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পর উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলভুক্ত তেররশিয়া পোড়াগ্রামের জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে। প্রায় দুই মাস আগে ‘গানবাজনা বা বাদ্যযন্ত্র মুক্ত সমাজ গঠন’ শিরোনামে একটি নোটিশ গ্রামজুড়ে প্রচার করা হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, গ্রামের পরিবেশ, যুবসমাজের নৈতিকতা ও পারিবারিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে শিরক, বিদআত, গানবাজনা ও অপসংস্কৃতি পরিহারের লক্ষ্যে গ্রামে প্রকাশ্যে উচ্চ শব্দে বাদ্যযন্ত্র বা গান বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো। নির্দেশ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশটিতে মসজিদ কমিটির সদস্য ও গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে মোট ৩৪ জন স্বাক্ষর করেন। পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়ে ব্যানার ও ফেস্টুনও টানানো হয়। এরপর থেকে গ্রামটিতে সামাজিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গানবাজনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হলে পুলিশ গ্রামে গিয়ে গানবাজনা নিষিদ্ধ সংক্রান্ত ব্যানার, ফেস্টুন ও নোটিশ জব্দ করে থানায় নিয়ে আসে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন জানান, ঘটনাটি জানার পর মসজিদ কমিটির সদস্যদের উপজেলা কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে কয়েকজন সেখানে এসে জানান, বিষয়টি না বুঝেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তারা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং মসজিদ কমিটির সভা করে গানবাজনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে লিখিতভাবে দপ্তরে জমা দেয়ার আশ্বাস দেন।
এদিকে, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই মাস আগে মসজিদের ইমাম ও কয়েকজন আলেমের উদ্যোগে গ্রামবাসীর একটি সভা হয়। সেখানে ‘সমাজ সংস্কার’–এর কথা বলে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শুধু সামাজিক অনুষ্ঠানই নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালাদের ক্ষেত্রেও এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য করা হয়।
এ সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গ্রামের কিছু প্রবীণ ব্যক্তি সিদ্ধান্তটির পক্ষে থাকলেও তরুণদের একটি বড় অংশ এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। গ্রামের কয়েকজন নারী জানান, বিয়েবাড়িতে গীত গাওয়া কিংবা সাউন্ডবক্সে গান বাজানো বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি যে বিয়েবাড়িতে গান বাজানো হবে, সেখানে গ্রামের আলেমরা বিয়ে পড়াতে যাবেন না বলেও জানানো হয়েছে। ফলে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের অনেকেই জানান, মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে আরও প্রচার করা হয়েছিল-যারা নিয়মিত নামাজ পড়বে না, তাদের জানাজা পড়ানো হবে না। তবে এ ধরনের বক্তব্য অনেকেই গ্রহণ করেননি। ওই গ্রামের এক দোকানদার জানান, তার দোকানে টেলিভিশন থাকলেও তিনি এখন আর গান চালান না। শুধু খবর বা ইসলামি আলোচনা শোনেন।
গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, বিয়ে মানেই আনন্দ-উৎসবের বিষয়। সেখানে গান বা গীত গাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কেউ যদি বিয়ে পড়াতে না চান, অন্য আলেম দিয়ে বিয়ে পড়ানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে গ্রামের মসজিদ কমিটির ওই সিদ্ধান্ত ঘিরে আলোচনা শুরু হলেও প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর তা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
ইউটি/টিএ