ইরান ইস্যুতে লাভবান মস্কো, বদলাচ্ছে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত
১২:১৮ পিএম | ০৮ মার্চ, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে রাশিয়া। সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং বিকল্প উৎসের খোঁজে ছুটছে ক্রেতারা। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন সস্তায় পাওয়া রুশ তেল এখন আবারও মূল্যবান ও চাহিদাসম্পন্ন হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ছাড়ে বিক্রি হচ্ছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মস্কোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল তেলের দামের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, জাহাজ পরিবহন, বীমা ও আর্থিক সেবায় বিধি-নিষেধ। এর উদ্দেশ্য ছিল ক্রেমলিনের জ্বালানি আয় কমিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করা।
এসব বিধি-নিষেধের কারণে রাশিয়াকে ক্রেতা আকর্ষণ করতে আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় প্রতি ব্যারেল রুশ তেলের দাম ১০ থেকে ১৩ ডলার কম ছিল।
তবে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সমীকরণ দ্রুত বদলে দিয়েছে। পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকিতে তেলবাজারে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বীমা খরচ বেড়েছে এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া সুযোগ পেয়েছে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার। এশিয়ার বাজারে আগে থেকেই স্থাপিত বাণিজ্যপথ ও বড় রপ্তানি সক্ষমতার কারণে রাশিয়া দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণের অবস্থানে রয়েছে।
যেখানে আগে বড় ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করতে হতো, এখন পরিস্থিতি উল্টো।
বর্তমানে ভারতের কাছে সরবরাহের ক্ষেত্রে রুশ তেল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্টের তুলনায় প্রতি ব্যারেলে ৪ থেকে ৫ ডলার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এটি দেখায়, কত দ্রুত বৈশ্বিক তেলবাজারের কাঠামো বদলে যাচ্ছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভারতীয় শোধনাগারগুলো বড় পরিমাণে কমদামের রুশ তেল কিনছিল। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল আমদানি চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলে সেই পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বিশেষ ৩০ দিনের ছাড় দেয়, যাতে সমুদ্রে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ রুশ তেল কেনা যায়।
এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের দ্বিধার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে বিচ্ছিন্ন করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এসেছে। কিন্তু পারস্য উপসাগরের সংঘাত এখন তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর জরুরি প্রয়োজন তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব পদক্ষেপ সাময়িক এবং সীমিত পরিসরে নেওয়া হয়েছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, এগুলোর উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর আরোপিত সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা দুর্বল করা নয়; বরং ইরানের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে তা সামাল দেওয়া।
এদিকে পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্রও উদ্যোগ নিচ্ছে। মার্কিন ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন অঞ্চলটিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধঝুঁকি বীমা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর লক্ষ্য হলো বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আশ্বস্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন আবারও স্বাভাবিক করা।
তবে এর মধ্যেই বৈশ্বিক তেলবাণিজ্যের অর্থনীতি বদলে যেতে শুরু করেছে। রুশ তেলের বাড়তি চাহিদা মস্কোর বাজার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে, এমন এক সময়ে যখন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তাদের জ্বালানি আয়ে চাপ সৃষ্টি করছিল।
রাশিয়ার কর্মকর্তারাও এই পরিস্থিতিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাক বলেছেন, এশীয় ক্রেতাদের চাহিদা বাড়লে রাশিয়া সরবরাহ বাড়াতে প্রস্তুত। তার ভাষায়, ‘আমরা সব সময় প্রস্তুত। রুশ তেলের চাহিদা রয়েছে। কেউ কিনতে চাইলে আমরা অবশ্যই বিক্রি করব।’
এসকে/টিকে