বিশ্ববাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ছাড়াতে পারে ১০০ ডলার
ছবি: সংগৃহীত
০৩:০২ এএম | ০৯ মার্চ, ২০২৬
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কয়েক সপ্তাহ বা এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে।
সংঘাত এখন অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে, কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ভোটারদের অসন্তোষ বাড়াতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এ পর্যন্ত বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি মূল্যে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪১ ডলার, যা গত এক সপ্তাহে ৪৩ সেন্ট বেড়েছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করে জানিয়েছে, সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯১ ডলারে স্থিত হয়েছে, যা ১৯৮৩ সালের পর থেকে রেকর্ড সাপ্তাহিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, জেপি মর্গানের বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখন কেবল ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির হিসাব করছে না; বরং বাস্তব সরবরাহ ব্যাঘাতের প্রভাবও সামনে আসছে।
রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কারণে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে।
সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান ও ওমানের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা এবং অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাতের ফলে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি প্রায় অচল হয়ে পড়ায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও কুয়েতসহ অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে তেল সরবরাহ স্থগিত করতে হয়েছে। এতে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বৈশ্বিক রিফাইনারিগুলোর কাছে পাঠানো সম্ভব হয়নি, যা বিশ্বের প্রায় দেড় দিনের চাহিদার সমান।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে এবং সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।
জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস এম. দাওয়ালেহ সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছোট রাষ্ট্রগুলো এই পরিস্থিতিতে আরও বড় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রভাবে দেশটির অর্থনীতি প্রায় জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ইরাক ও কুয়েতের কয়েকটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে এবং বিশ্লেষকদের মতে সংযুক্ত আরব আমিরাতও শিগগির একই পদক্ষেপ নিতে পারে।
অঞ্চলের একটি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে খুব শিগগিরই অনেক দেশকে তেল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করতে হতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
টিজে/টিএ