বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়িয়ে গেল ১১৪ ডলার, শেয়ারবাজারেও বড় ধস
ছবি: সংগৃহীত
১০:১৯ এএম | ০৯ মার্চ, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ক্রমেই আরও তীব্র হচ্ছে এবং এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের পতন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খবর বিবিসি
এদিকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে মনোনীত করা হয়েছে বলে রোববার ইরান ঘোষণা দিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত শুরুর এক সপ্তাহ পরও দেশটির নিয়ন্ত্রণে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বেশ ভালোভাবেই আছে।
এর আগে সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় তেল সংরক্ষণাগারসহ একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছ এবং এই অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভোক্তা ও ব্যবসার জন্য জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন অবস্থায় সোমবার (৯ মার্চ) সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ দশমিক ৭৪ ডলারে পৌঁছায়।
একই সময়ে নাইমেক্স লাইট সুইট ক্রুডের দাম ২৬ শতাংশের বেশি বেড়ে ১১৪ দশমিক ৭৮ ডলারে দাঁড়ায়।
এদিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারেও বড় পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে, হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক ৩ শতাংশের বেশি নেমে গেছে এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক সংঘাত শুরুর পর থেকেই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে। সোমবার এটি ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়, ফলে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ রাখতে হয়। এই ধরনের লেনদেন স্থগিতের ব্যবস্থাকে ‘সার্কিট ব্রেকার’ বলা হয়, যা আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়। গত বুধবারও কোসপি সূচক ১২ শতাংশ পড়ে গেলে একই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
মূলত বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারের অনেক বিশ্লেষক আগেই ধারণা করেছিলেন, এ সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াবে। বাস্তবে এশিয়ার শুরুর লেনদেনেই মাত্র এক মিনিটের মধ্যে দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যায় এবং এরপর আরও ১৫ মিনিটে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
অবশ্য গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারে কিছুটা স্বস্তি ছিল, যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কারণ সেগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে পারছিল না।
তবে সপ্তাহান্তে সংঘাত আরও বাড়ার পাশাপাশি ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে বৈশ্বিক বাজার দ্রুত আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। আর এখন বড় প্রশ্ন হলো পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার অবস্থা মার্চের শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারের বেশি হয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের আদনান মাজারেই বলেন, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের লক্ষণ দেখা যাওয়ায় তেলের দাম বাড়াটা প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে যে এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে না’। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যে আশ্বাস ও লক্ষ্য সামনে রেখেছিল, সেগুলো এখন ‘ক্রমেই অবাস্তব হয়ে উঠছে’।
এদিকে তেলের দাম বাড়লে জেট ফুয়েলসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ হওয়া জ্বালানির বড় অংশই এশিয়ায় ব্যবহার করা হয়। তবে এশিয়ার ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের জন্য বেশি দাম দিতে শুরু করেছেন বলে ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ফলে ইউরোপের দিকে যাওয়া কিছু ট্যাংকার আটলান্টিকের মাঝপথ থেকেই দিক পরিবর্তন করছে।
অন্যদিকে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি দূর করতে স্বল্পমেয়াদে দামের এই বৃদ্ধি ‘ছোট মূল্য’ মাত্র।
এসকে/টিকে