নতুন বাস্তবতায় ব্যতিক্রমী এবারের সংসদ
ছবি: সংগৃহীত
০১:৪৪ পিএম | ১১ মার্চ, ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছে বিএনপি।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
তবে এবারের সংসদ গঠন কাঠামো, সদস্য বিন্যাস এবং শুরুর প্রক্রিয়া— সব দিক থেকেই ব্যতিক্রমী বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংসদ গবেষকরা।
সংবিধান অনুযায়ী, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবেই মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হচ্ছে এই সংসদ। তবে এবারের সংসদকে ব্যতিক্রম বলার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর সদস্য কাঠামো।
নির্বাচিত ২৯৬ সংসদ সদস্যের মধ্যে ২২৭ জনই এবার প্রথমবারের মতো সংসদীয় আসনে পা রাখছেন, যা মোট সদস্যের প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ প্রধান দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
যে কারণে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী সংসদের কার্যপ্রণালি, বিধিবিধান, স্থায়ী কমিটির কাজ, আইন প্রণয়নের জটিল প্রক্রিয়াগুলো বুঝতেও কিছুটা সময় লাগবে আগামী সংসদের।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কেএম মহিউদ্দিন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। এ নিয়ে তার বইও প্রকাশিত হয়েছে।
অধ্যাপক মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রথমত এবারের নির্বাচনে যারা নির্বাচিত তাদের ৭৫ শতাংশের বেশি প্রথমবারের মতো সংসদে। তাদের অনেকেরই কার্যপ্রণালি বিধি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেই। যে কারণে এবারে সংসদে কিছু কিছু ব্যতিক্রমী বিষয়ও দেখা যেতে পারে।’
এবারের সংসদের আরেকটি বড় ব্যতিক্রমী দিক হলো অধিবেশনের শুরু ও সভাপতিত্ব নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতা। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এই শূন্যতায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি বা নবনির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে কাউকে সাময়িকভাবে স্পিকারের আসনে বসানো হতে পারে। অধ্যাপক কেএম মহিউদ্দিনের মতে, এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
সংসদ পরিচালনার প্রথা অনুযায়ী, প্রথম দিনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবার বিএনপি তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের ঘোষণা দিলেও প্রক্রিয়াটি নিয়ে এখনো কিছু ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ করানোর মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এরপরই শুরু হবে সংসদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা— রাষ্ট্রপতির ভাষণ। সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যে ভাষণ দেবেন, তাতে নতুন সরকারের পরিকল্পনা ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতির একটি রূপরেখা থাকবে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক মহিউদ্দিন বলেন, ‘অনেক সময় একই দিনে স্পিকার ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়ে থাকে। তাদের দুইজনকেই একই দিনে একই সঙ্গে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি।’
তবে এবার একই দিনে ডেপুটি স্পিকারের শপথ নাও হতে পারে বলেও মনে করছেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এই শিক্ষক।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও তাদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার পরই রাষ্ট্রপতির ভাষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। স্পিকার/ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের অধিবেশন শুরু হবে।
সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে সরকারের নীতি ও গত শাসনামলের একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরবেন। এই ভাষণটি আগে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হয়। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর সংসদ সদস্যরা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেবেন।
যেহেতু অধিকাংশ সদস্যই নতুন, তাই এই বিতর্ক পর্বে তরুণ ও নতুন জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক মহিউদ্দিন বলছেন, ‘এই বক্তব্য মূলত বিগত শাসনমালের নানা বিষয় যেমন যুক্ত থাকে তেমনি নতুন সরকার গঠন এবং এই সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।’
সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে ওইদিনের মতো অধিবেশন শেষ হয়ে যায় বেশিরভাগ সময়। তবে ভাষণের দিন সাধারণত কোন ধরনের প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে না।’
ওই অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়। এর ওপর জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নানা আলোচনা করে থাকেন বলেও জানান সংসদ গবেষকরা।
সংসদ পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো এর ‘কার্যপ্রণালী বিধি’ বা রুলস অব প্রসিডিউর। প্রতিদিনের আলোচনার বিষয়বস্তু বা ‘অর্ডার অব দ্য ডে’ নির্ধারণ করবেন স্পিকার, যা আগে থেকেই সদস্যদের সরবরাহ করা হবে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বা আইন পাশের ক্ষেত্রে এবার কণ্ঠভোটের পাশাপাশি বিভক্তি ভোটের প্রয়োগ নিয়ে সদস্যদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ থাকবে।
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন লিখিত ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ : কাঠামো, কার্যপদ্ধতি ও চর্চা’ বইয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কীভাবে হয় সেই পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বিধি অনুযায়ী স্পিকার কর্তৃক সংসদে পেশকৃত কোনো প্রস্তাব সম্পর্কে নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে আলোচনা ও বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় এবং সবশেষে সংসদ সদস্যদের ভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সংসদে উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব সম্পর্কে বিতর্ক শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রথম উপায় হলো কণ্ঠভোট। কণ্ঠভোটের ফলাফল ঘোষণার পর ভোট গণনা নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে সেক্ষেত্রে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
তবে বিপুল সংখ্যক নতুন সদস্যের জন্য সংসদের এই জটিল আইনকানুন এবং কণ্ঠভোট বা বিভক্তি ভোটের মতো পদ্ধতিগুলো আয়ত্ত করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।
সংসদ গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, নতুন এই সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব যদি সদস্যরা দ্রুত সংসদীয় নিয়ম-কানুন আত্মস্থ করতে পারেন। সব মিলিয়ে এই ব্যতিক্রমী সংসদ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এক বিশেষ পরীক্ষা ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে নতুন নেতৃত্ব, বিশাল সংখ্যক নতুন মুখ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাওয়া এই ত্রয়োদশ সংসদ বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এক বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখা দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা
টিজে/এসএন