© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

একটি ‘না’ গণভোট বদলে দিয়েছিল একটি দেশকে, সেই ইতিহাসের গল্প সিনেমায়

শেয়ার করুন:
একটি ‘না’ গণভোট বদলে দিয়েছিল একটি দেশকে, সেই ইতিহাসের গল্প সিনেমায়

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১১:২১ এএম | ১২ মার্চ, ২০২৬
চিলির রাজনৈতিক ইতিহাস বুঝতে চাইলে দুটি চলচ্চিত্র বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ‘মিসিং’ এবং ‘নো’। বিশেষ করে ‘নো’ চলচ্চিত্রটি দেখায় কীভাবে একটি গণভোট পুরো একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। যারা এখনো সিনেমাটি দেখেননি, তাঁদের জন্য এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়; বরং একটি দেশের ইতিহাস ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

চিলির সেই ঐতিহাসিক গণভোটে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’। ‘হ্যাঁ’ মানে সামরিক শাসক জেনারেল অগাস্তো পিনোশে আরও আট বছর ক্ষমতায় থাকবেন। আর ‘না’ মানে হবে দেশে নতুন নির্বাচন আয়োজন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। বলা যায়, এই গণভোটের ফলাফলই চিলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছিল।

চিলির এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের কথা আসে, সেটি হলো ‘মিসিং’। আশির দশকে যখন দেশে ভিসিআর ও ভিসিপির যুগ ছিল, তখন অনেক দর্শকের মতোই অনেকের প্রথম দেখা রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি ছিল এটি। ঢাকার মহাখালী এলাকার ভিডিও ভাড়ার দোকান থেকে ক্যাসেট এনে দেখা হতো সিনেমাটি। বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত এই ছবিটি অনেক দর্শকের কাছে রাজনৈতিক ও সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছিল।

১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া গ্রিক নির্মাতা কোস্তা গাবরাস পরিচালিত ‘মিসিং’ চলচ্চিত্রটির পটভূমি চিলির ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন সেনাপ্রধান জেনারেল অগাস্তো পিনোশে। এই অভ্যুত্থানের মধ্যেই নিখোঁজ হয়ে যান মার্কিন সাংবাদিক চার্লস হরমান। তাঁর খোঁজে চিলিতে আসেন তাঁর বাবা এডমন্ড হরমান। ছবিটি সেই অনুসন্ধানের গল্পই তুলে ধরে।

চলচ্চিত্রটি শুধু একটি পরিবারের দুঃখজনক অভিজ্ঞতার গল্প নয়; বরং এতে অনুসন্ধান করা হয়েছে ওই সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা ছিল কি না। সে সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে ‘মিসিং’ ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কারও লাভ করে।

চিলির সেই অভ্যুত্থানের পর দেশটি দীর্ঘ সময় সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। ষাটের দশকে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত দেশটি ১৯৭০ সালে বামপন্থী জোটের নেতা সালভাদর আয়েন্দেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল। আয়েন্দে দেশের সম্পদ পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেন, কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বিরোধিতার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।



১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী পরিকল্পিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে অবরুদ্ধ অবস্থায় আয়েন্দে আত্মসমর্পণ না করে আত্মহত্যা করেন বলে জানা যায়। এরপর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং শুরু হয় ব্যাপক দমন-পীড়ন। হাজার হাজার আয়েন্দে সমর্থক গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন। ইতিহাসবিদদের মতে, লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এটি অন্যতম রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান।

ক্ষমতায় এসে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ধীরে ধীরে পুরো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। বিরোধীদের দমন করতে তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করেন, যার অভিযানে বহু মানুষ নিখোঁজ হন। একই সময়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদদের নিয়ে বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি চালু করেন। এতে কিছু খাতে উন্নতি হলেও অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে।

পরে আরেকটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিনোশে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা তীব্র হয়। ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে একটি গাড়িবোমা হামলায় নিহত হন চিলির সাবেক মন্ত্রী অরল্যান্ডো লেটেলিয়ের ও তাঁর সহকারী রনি কার্পেন মফিট। তদন্তে বেরিয়ে আসে, এই হামলার পরিকল্পনা চিলির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও চাপের মুখে পিনোশে ১৯৮০ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। এতে বলা হয়, ১৯৮৮ সালে গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তিনি ক্ষমতায় থাকবেন কি না। এদিকে তখন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খারাপ হয়ে পড়েছিল। বেকারত্ব বাড়ে, বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়। এমনকি অনেক জায়গায় নারীরা খালি হাঁড়ি বাজিয়ে প্রতিবাদ জানান।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় সেই ঐতিহাসিক গণভোট। ভোটারদের সামনে ছিল দুটি বিকল্প—‘হ্যাঁ’ ও ‘না’। ‘হ্যাঁ’ মানে পিনোশে আরও আট বছর ক্ষমতায় থাকবেন, আর ‘না’ মানে হবে নতুন নির্বাচন আয়োজন।

এই গণভোটকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে ২০১২ সালের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘নো’। ছবির কাহিনি এক তরুণ বিজ্ঞাপন নির্মাতাকে ঘিরে। তাঁর দায়িত্ব ছিল পিনোশের বিরুদ্ধে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা তৈরি করা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রতিদিন মাত্র পনেরো মিনিট প্রচারণার সুযোগ দিয়েছিল।

চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ‘না’ পক্ষের প্রচারণায় প্রথমে পিনোশে আমলের নির্যাতন ও দমন-পীড়নের ভয়াবহ দৃশ্য তুলে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপন নির্মাতা রেনে সাভেদ্রা মনে করেন, শুধু ভয় দেখিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করা যাবে না। তিনি মনে করেন, মানুষের সামনে আশা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও তুলে ধরা প্রয়োজন।

এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ভিন্ন ধরনের প্রচারণা, যা শেষ পর্যন্ত চিলির ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। সেই গল্পই তুলে ধরেছে আলোচিত চলচ্চিত্র ‘নো’।

এমকে/এসএন

মন্তব্য করুন