আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য প্রকৃত হুমকি কে, ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল?
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৪৬ পিএম | ১৩ মার্চ, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য প্রকৃত হুমকি কে, ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল? তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোসেফ মাসাদ। তার সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে উঠে এসেছে, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি এসব দেশকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে উল্টো চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যে হামলা শুরু হয়েছে, তাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি অস্থির সময় পার করছে। ইসরায়েল এবং মার্কিন বিমানবাহিনী সমন্বিতভাবে এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধকে এক ধরনের ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সহযোগীরা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জাতি হিসেবে তুলে ধরে অ-খ্রিস্টান ও অ-শ্বেতাঙ্গ বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে বয়ান তৈরি করছেন, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে ইরানের ওপর হামলার আগে মার্কিন কমান্ডোদের উদ্দেশ্যে ‘আরমাগেডন’ বা যিশুর পুনরুত্থানের মতো ধর্মীয় অনুষঙ্গ ব্যবহার করার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর সারা বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এই ধরনের প্রোপাগান্ডা যুদ্ধের আড়ালে থাকা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকেই সামনে নিয়ে আসে।
মার্কিন রাজনীতির ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর আদর্শিক বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান এবং জায়নবাদীরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, অন্যদিকে মার্কিন বামপন্থীরা দাবি করছেন যে ইসরায়েল মূলত নিজের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়েছে। তবে জোসেফ মাসাদের মতে, ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী নীতিগুলো মার্কিন সামগ্রিক কৌশলেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসরায়েলকে এখানে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই বরং তারা এই অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি বিশ্বস্ত প্রতিনিধি (সাব-কন্টাক্টর) হিসেবে কাজ করছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলো এই যুদ্ধ থেকে বিপুল মুনাফা অর্জনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। লকহিড মার্টিন, বোয়িং বা রেথিয়নের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলি স্বার্থের চেয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকেই বড় করে দেখে।
অথচ অনেক সমালোচক বিষয়টিকে কেবল ইসরায়েলি লবির প্রভাব হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেন। বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটন চাইলে যেকোনো সময় ইসরায়েলকে নিবৃত্ত করতে পারতো, কিন্তু তারা তা না করে বরং ইসরায়েলি যুদ্ধ পরিকল্পনাকে অনুমোদন ও সমন্বয় করেছে।
এই চরম উত্তেজনার মাঝে আরব দেশগুলোর নীরবতা অনেককেই অবাক করেছে। ওমান ছাড়া আর কোনো আরব দেশ ইরানের ওপর এই হামলার নিন্দা জানায়নি। এমনকি ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু বা হাজারো বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও আরব দেশগুলো শোক প্রকাশ করেনি। বিপরীতে তুরস্কের মতো ন্যাটো সদস্য দেশও ইরানের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো যারা একসময় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল, তারাও এখন মার্কিন ঘেঁষা নীতি গ্রহণ করে ইরানের পাল্টা হামলার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে।
জর্ডান এবং উপসাগরীয় দেশগুলো দাবি করছে যে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে, অথচ তারা মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের ভূমি ব্যবহার করে ইরানে হামলার সুযোগ করে দিচ্ছে। এসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশের আকাশসীমা ও ভূখণ্ডকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। অথচ ইরান যদি রাশিয়া বা চীনের কোনো ঘাঁটি ব্যবহার করে একই কাজ করতো, তবে এই আরব দেশগুলো নিশ্চিতভাবেই তাকে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে গণ্য করতো।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান কখনোই কোনো আরব দেশকে আগে আক্রমণ করেনি। এমনকি আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যখন আরব দেশগুলো সাদ্দাম হোসেনকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিল, তখনও ইরান তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আরব শাসকরা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে ইরানকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার যে কৌশল নিয়েছেন, তা শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য বা তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই জোট তাদের আরও বিপদের মুখে ফেলেছে।
বর্তমান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে যদি আরব দেশগুলো শিক্ষা না নেয় যে তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রকৃত হুমকি ইরান নয় বরং মার্কিন-ইসরায়েলি জোট, তবে ভবিষ্যতে তাদের আরও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। রাশিয়া ইতিমধ্যে আরব দেশগুলোর তথাকথিত নিরপেক্ষতার ভণ্ডামি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। লেখক জোসেফ মাসাদ স্পষ্টভাবেই দেখিয়েছেন, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলে শান্তির বদলে কেবল সংঘাতই ডেকে আনছে। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আরব বিশ্বকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এমআর/টিকে