ইরানের ঝোড়ো হামলায় বিশ্বশক্তির দ্বারস্থ ট্রাম্প!
ছবি: সংগৃহীত
১১:০৫ এএম | ১৫ মার্চ, ২০২৬
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। ইরানের তেল রপ্তানির লাইফলাইনখ্যাত খারগ দ্বীপে হামলার পর তারা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করেছে। দফায় দফায় হামলা করেছে তেহরান।
আবুধাবি ও দুবাইয়ের বন্দর আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আড়াই হাজার মেরিন সেনা ও একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। হামলা বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের তথ্য দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন।
একই সঙ্গে ইসরায়েলকে এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করতে সময় দিয়েছে। ইরানও জবাব দিচ্ছে ক্ষীপ্রতার সঙ্গে। তাদের হামলায় আরও পাঁচটি সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরানের বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ মুক্ত করতে তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিশ্বশক্তিগুলোকে রণতরী পাঠাতে আহ্বান জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত নৌপথের সুরক্ষায় শনিবার যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ওই আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।
এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় হরমুজ প্রণালির সুরক্ষায় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে ওই প্রণালিকে নিরাপদ করার জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগির ওই প্রণালি দিয়ে চলাচল করা সব তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে সামরিক পাহারায় পারাপারের ব্যবস্থা শুরু করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, অনেক দেশ, বিশেষ করে যারা ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রচেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে এই পথটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।
মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশ- যারা এই কৃত্রিম বাধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা এই অঞ্চলে নিজেদের জাহাজ পাঠাবে বলে প্রত্যাশা করছি।
তবে কোন কোন দেশ এই পদক্ষেপে অংশ নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি তিনি।
এর আগে ইরানের জ্বালানি রপ্তানির লাইফলাইনখ্যাত খারগ দ্বীপে হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোস্ট করা ও সিএনএনের ভৌগোলিকভাবে শনাক্ত করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরানের খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলায় বিমানবন্দর ও রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভিডিওজুড়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
তবে খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলার পরও দ্বীপটি থেকে তেল রপ্তানি কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, খারগ দ্বীপ থেকে রপ্তানি ‘সম্পূর্ণরূপে চলমান’ এবং দ্বীপে তেল কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বিনা বাধায় অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানোর পর সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি অবরোধ অব্যাহত রাখে তবে দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলো মার্কিন হামলার পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
খারগ দ্বীপ থেকে ইরানের ৯০ শতাংশের বেশি তেল রপ্তানি হয়।
আমিরাত, ইরাক, বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা: সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিতে এবং বাহরাইন ও কুয়েতের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর ‘টানা কয়েক দফায়’ হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরিকে উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছেন।
হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ঘাঁটিগুলোর মধ্যে আবুধাবির আল-দাফরা এবং বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটির নাম উল্লেখ করেছেন আইআরজিসির নৌপ্রধান।
আলিরেজা আরও দাবি করেন, এই হামলায় প্যাট্রিয়ট রাডার সিস্টেম, যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সংরক্ষণের ট্যাংক নিশানা করা হয়েছিল। এ ছাড়া ইরাকের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে ২৪ ঘণ্টায় ৮ বার আক্রমণ করেছে ইরান।
ইরান যুদ্ধে অংশ নিতে রওনা দিয়েছে ২ হাজার ৫০০ মার্কিন স্থলসেনা: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে প্রথমবারের মতো আড়াই হাজার মার্কিন মেরিন সেনার একটি দল মোতায়েন করা হচ্ছে।
জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থিত নিজেদের ঘাঁটি থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যরা এখন যাত্রাপথে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’।
এ যুদ্ধজাহাজ থেকেই মেরিন সেনারা সরাসরি রণক্ষেত্রে নামবেন। কোনো সংকট মোকাবিলা কিংবা ইরানের কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে।
মূলত এ মেরিন সেনারাই হতে যাচ্ছেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধে মোতায়েন হওয়া প্রথম মার্কিন স্থলসেনা।
মোজতবা খামেনিকে ধরিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা: ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস প্রোগ্রাম’ থেকে শুক্রবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রকল্পটি ‘ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিস’ পরিচালনা করে।
বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিসহ কয়েকজন নেতার ছবি প্রকাশ করা হয়।
সৌদিতে ইরানের হামলায় ৫টি মার্কিন রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) উড়োজাহাজ ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় উড়োজাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি।
যুদ্ধ শেষ করতে ইসরায়েলকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে ওয়াশিংটন: ইরান যুদ্ধ শেষ করতে ইসরায়েলকে এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিকট ভবিষ্যতে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে ওয়াশিংটন। কারণ, ইরানে সরকার পতনের জন্য হয় সরাসরি বড় ধরনের স্থল অভিযান চালাতে হবে, নয়তো দেশজুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভের প্রয়োজন হবে, যার কোনোটিরই আপাতত লক্ষণ নেই।
সূত্রটি বলছে, এই যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের ফারাক দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন মূলত এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজার ও তেলের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।
পুতিন ইরানকে হয়তো ‘কিছুটা’ সহায়তা করছেন, বলছেন ট্রাম্প: ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানকে ভ্লাদিমির পুতিন এবং রাশিয়া ‘কিছুটা’ সহায়তা করছে বলেই তার বিশ্বাস।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এও বলেন, রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেনকে সহায়তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অবস্থানের তথ্য ইরানের সঙ্গে বিনিময় করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে সহায়তা করছে।
এসকে/টিকে