যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ও মূল্য কমছে
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৪১ এএম | ১৮ মার্চ, ২০২৬
একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পরিমাণ যেমন কমছে তেমনি দেশটিতে রফতানিকৃত পোশাকের মূল্যও কমছে।
যেমন গত বছরের জানুয়ারি মাসের চেয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ।
গত বছরের জানুয়ারিতে দেশটিতে পোশাক রফতানি হয়েছিল ৭৯৮.৯৯ মিলিয়ন ডলারের, এ বছর কমে ৭৯১.৭৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলস (অটেক্সা) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অটেক্সাটার তথ্যে আরও জানা যায়, একই সময়ে বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য অনেক দেশের পোশাক রফতানি কমেছে মার্কিন বাজারে। যেমন চীনের কমেছে সবচেয়ে বেশি, ৬২.৩২ শতাংশ। এ ছাড়া ভারতের রফতানি কমেছে ১৮.৩০ শতাংশ কমেছে, পাকিস্তানের কমেছে ৩.৫০ শতাংশ।
তবে এই সময়ে মার্কিন বাজারে সবচেয়ে বেশি পোশাক রফতানি বেড়েছে কম্বোডিয়ার ২৫.৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় বেড়েছে ৭.২২ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের বেড়েছে ৩.০৯ শতাংশ।
এদিকে অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানিতে পতন রেকর্ড করা হয়েছে। আমদানির মূল্য ২০২৫ সালের জানুয়ারির ৭.১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৬.২২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৫১ শতাংশ কম।
পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি (এসএমইতে) ১৭.০৯ শতাংশ কমেছে, তবে একই সময়ে গড় একক মূল্য ৪.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, আমদানিকৃত পোশাকের সংখ্যার তুলনা করলে দেশভেদে প্রতি পিসের একক মূল্য হিসেবেও বাংলাদেশের পোশাক মূল্য কমেছে। বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য কমেছে ২.০৬ শতাংশ।
এ ছাড়া ভিয়েতনামের কমেছে ০.৬০ শতাংশ, চীনের কমেছে ২২.৭৪ শতাংশ, ভারতের কমেছে ৩.৪৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ার কমেছে ১.৯৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার কমেছে ২.২৩ শতাংশ। তবে পাকিস্তানের পোশাকের মূল্য বেড়েছে ০.২৯ শতাংশ।
১০ শতাংশ কম দাম পান বাংলাদেশের রফতানিকারকরা : এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম দাম পান। এর প্রধান কারণ হিসেবে মূলত যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে নতুন এক গবেষণায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উভয় বাজারেই বড় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট রফতানিকারকদের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেশি দাম পায়। দরকষাকষির সক্ষমতা ও পণ্যের তুলনামূলক উন্নত মানকে এর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)। এতে ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ের কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে থাকা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ রফতানি তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক পরামর্শ সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে র্যাপিডের উপপরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, ‘গড় হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০ শতাংশেরও বেশি কম দামে পণ্য বিক্রি করে।’
তিনি আরও বলেন, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা না থাকায় উচ্চ শুল্কের কারণে রফতানিকারকদের নিজেদের মুনাফা কমিয়ে শুল্কের একটি বড় অংশ বহন করতে হয়, যাতে অন্য দেশের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়। তিনি বলেন, ‘আরও অনুকূল বাণিজ্য ব্যবস্থা থাকলে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হতে পারে।’
১০ ধরনের পোশাক পণ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের তুলনায় ৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জার্মানির বাজারে টি-শার্ট রফতানিতে রফতানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৭ শতাংশ বেশি দাম পান। একইভাবে ট্রাউজারের ক্ষেত্রে জার্মানির বাজারে দাম যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৯ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।
স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) স্কিমের আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করে। পাশাপাশি পোশাকের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন শর্তসহ তুলনামূলকভাবে নমনীয় ‘রুলস অব অরিজিন’ সুবিধাও দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় ৬৬ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় বাজারেই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে।
দরকষাকষির সক্ষমতা, পণ্যের উন্নত মান এবং বেশি লাভজনক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আকারের প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় বেশি।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যারা নিটওয়্যার পোশাক রফতানিতে বেশি মনোযোগী, তারা গড়ে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ কম দাম পায় যা নিটওয়্যার পণ্যের তুলনামূলক কম মূল্যকে নির্দেশ করে।
রফতানিতে সরাসরি ক্রেতার কাছে ডকুমেন্ট পাঠানোর সুযোগ : অন্যদিকে রফতানিকারকদের জন্য নতুন সুবিধা চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে এক লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে পরিবহন বা শিপিং ডকুমেন্ট সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পাঠাতে পারবেন রফতানিকারকরা।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ ও গতি আনতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো এখন রফতানিকারকদের বিদেশি আমদানিকারক বা তাদের মনোনীত পক্ষের নামে শিপিং ডকুমেন্ট প্রস্তুত করার সুযোগ দিতে পারবে। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে রফতানিকারকরা ডকুমেন্টগুলো সরাসরি আমদানিকারক বা তাদের মনোনীত ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অনেক বিদেশি ক্রেতা দ্রুত পণ্য ছাড় করার সুবিধার জন্য নিজেদের নামে শিপিং ডকুমেন্ট ইস্যু করতে চান। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে রফতানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
তবে রফতানি আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু শর্তও রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত হতে হবে যে সংশ্লিষ্ট পণ্যের জন্য বৈধ রফতানি আদেশ রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতা বা কনসাইনির পরিচয়ও যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে।
ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নতুন এই সুবিধা রফতানিকারকদের জন্য বিশ্ববাজারে ব্যবসা করা সহজ করবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের শর্ত পূরণে আরও নমনীয়তা তৈরি হবে এবং রফতানি আয় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও নিশ্চিত করা যাবে।
টিজে/এসএন