তীব্র অর্থকষ্ট ছিল সুমনের, বলছে জয়ের খোলাচিঠি
ছবি: সংগৃহীত
০১:০৬ পিএম | ১৮ মার্চ, ২০২৬
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তীব্র অর্থকষ্টে কেটেছে শামস সুমনের জীবন। সহশিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয়ের ফেসবুক পোস্ট বলছে সেকথা। সুমনের মৃত্যুতে ভেঙে চৌচির এই অভিনেতা। বন্ধুকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছেন অসীম ভালোবাসা।
গতকাল ১৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান নব্বই দশকের অভিনেতা শামস সুমন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শোকের মাতম ওঠে বিনোদন অঙ্গনে। ফেসবুকে বন্ধু ও অনুরাগীরাও শোকের কলম নিয়ে বসেন। সহশিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয় লেখেন, ‘সপ্তাখানেক আগে একসাথে ইফতারি করেছিলাম। দেশের একটি গণমাধ্যমতে তার সাথে কথা হতো না এমন দিন খুব কমই আছে। মৃত্যুর আগের দুই মাস অনেক গল্প হয়েছে, অনেক কিছু জেনেছি তার কাছে, তার যাপিত জীবন সম্পর্কে। তার জীবন অনেক কাছ থেকে দেখেছি। পবিত্র এই দিনে চলে গেলি ভাই। ইনশাল্লাহ ইনশাল্লাহ তুই বেহেস্তি।’

সুমনকে হারানোর পর ভীষণ ভেঙে পড়েছেন জয়। মাঝরাতে এক দীর্ঘ পোস্ট লিখেছেন ফেসবুকে, যেন প্রয়াত সুমনের কাছে লেখা তার খোলাচিঠি। সেই চিঠি পড়লে বোঝা যায় তাদের ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব। তার চিঠি থেকে বোঝা যায়, ভীষণ অর্থকষ্ট ও মনকষ্টে ভুগছিলেন শামস সুমন।
সুমনকে প্রথম দেখা ও বন্ধুদের ঘটনা জানিয়ে জয় লিখেছেন, ‘তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম শাহবাগে পিজি হাসপাতালের সামনে। মহিলা সমিতিতে তোমার মঞ্চনাটকের বলিষ্ঠ অভিনয়, শুদ্ধ কণ্ঠস্বর আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই সময় আমি নাট্যজনে সাধারণ নাট্যকর্মী হিসেবে ছিলাম। একটা জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে নাট্যজন তোমাকে টাকার বিনিময়ে চরিত্রের রূপায়ণের জন্য ডাকতো, কারণ ওই চরিত্রে তুমি ছিলে অপরিহার্য। আমি ভাবতাম সকলে টাকা খরচ করে অভিনয় করে, অথচ তোমাকে টাকা দিয়ে অভিনয় করায়, কত বড় অভিনেতা তুমি। তারপর ধীরে ধীরে তোমার সাথে নাটকের অভিনয় দেখা হয়, বন্ধুত্ব হয়। বয়সে ছোট হলেও তুমি বন্ধুত্ব করে নাও আমার সাথে।’
শামস সুমন ও শাহরিয়ার নাজিম হয় একত্রে করেছেন বহু নাটক। সেসব স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা একবার ইন্দোনেশিয়া যাই, ফ্লোরিং করে একসাথে দুজন ঘুমাই। একটা বিশেষ কারণে দুইজন দুপাশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে একসাথে হেসে দেই, কারণ দুজনের মনেই একটা বিষয় কাজ করছিল, সেই বিষয়টা না হয় না-ই বললাম। শুধু তুমি আর আমি তা। বিশাল বড় স্ক্রিপ্ট এবং ক্যারেক্টার বিপুল রায়হানকে প্লেনের ভিতরে কনভিন্স করে ছোট করে ফেলি তুমি এবং আমি। কারণ বিদেশে অভিনয়ে যেন আমাদের প্রেসার না পড়ে, আমরা যেন অল্প কাজ করে বেশি আনন্দ করতে পারি। তারপর ঢাকায় টেলিভিশন নাটকে যেখানে তুমি সেখানে আমি। এত এত নাটক একসাথে করেছি... প্রায়ই তুমি বলতে, আমরা একজন মরলে আরেকজনকে দেখা যাবে। কারণ সব কাজই একসাথে সেই ২০০০ সাল থেকে ২০০৪-৫ পর্যন্ত।’
হতাশায় নিমজ্জিত ছিলেন সুমন। যাপন করতেন নিঃসঙ্গ জীবন। সে প্রসঙ্গে জয় লিখেছেন, ‘শেষের দিকে তোমার সাথে যখন কথা হতো, আমি তোমার কাছ থেকে শুধু হতাশার কথা শুনতাম। আমি তোমাকে সাহস দেওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এবং বোঝাতে চেষ্টা করতাম, তুমি জীবনটাকে এত হালকা ভাবে নিচ্ছো কেন, তুমি সিরিয়াস হচ্ছো না কেন, তুমি কাজের প্রতি আরো বেশি ডেডিকেটেড হচ্ছো না কেন? আমার এই কেনর উত্তর তুমি শুধু হাসি দিয়েই উড়িয়ে দিতে। তারপর তোমার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের গল্প আমাকে সব খুলে বলেছিলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন তুমি টানাপোড়েন থেকে বের হতে পারছ না। তুমি আমাকে বলেছ, তুমি চেষ্টা করছো, কিন্তু পারছ না। কিন্তু না পারতে পারতে মানসিক চাপ নিতে নিতে তুমি যে চোখের সামনে এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে, আমি অনুমান করলেও এটা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবিনি।’
সুমনের অর্থকষ্ট গভীরভাবে ভাবিয়েছে জয়কে। জয় লিখেছেন, ‘তোমার জীবন থেকে যা শিখলাম, পৃথিবীতে তুমি যত কাজ করো না কেন, যত সম্মান অর্জন করো না কেন, তোমার যা টাকা লাগবে তা যদি তোমার কাছে না থাকে, তাহলে তুমি সত্যিই মানসিক চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে। আমি জানি তোমার বেলায় তাই হয়েছে। বাচ্চাদের জন্য তোমার অনেক চিন্তা ছিল। তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তুমি তা জোগাড় করতে পারছিলে না। তোমার ফ্যামিলির লন্ডনে থাকে, তারা চেয়েছিল তুমি লন্ডন চলে যাও। কিন্তু তুমি দেশ ছেড়ে যাবে না। এই নিয়ে ছিলে এক বিশাল দ্বন্দ্ব। সবাই চলে গেল। তুমি একা রয়ে গেলে রেডিও ভূমিতে এবং মাতৃভূমিতে। তোমার বয়সে পুরুষ একা থাকতে পারে না। থাকবেই বা কেন? একা থাকার জন্য তো সে জীবনের শুরুতে সংসার শুরু করেনি। একা থাকার জন্য সে সমস্ত রোজগার সংসারের জন্য ব্যয় করেনি। সবাই সবার ভবিষ্যতের জন্য, উন্নত জীবনের জন্য যার যার গন্তব্যে চলে গেছে। আর তুমি তাদের সবকিছু দিয়ে একা একা স্যাকরিফাইস করেছ। খাবার অসুবিধা, লোকের অসুবিধা, টাকার অসুবিধা! এত অসুবিধা নিয়ে ৬০ বছর বয়সে বাঁচা কি সম্ভব? না সুমন ভাই। সম্ভব না। কারো কোনো দোষ নেই, ভাবীরও নেই, বাচ্চাদেরও নেই, তোমারও নেই। দোষ তোমার ভাগ্যের। দোষ তোমার দেশপ্রেমের।’
অনেক শিল্পী দেশ ছেড়েছে। দেশ ছেড়েছিল সুমনের পরিবারও। সুমন কেন দেশেত্যাগ করতে পারেননি? জয় লিখেছেন, ‘লন্ডন চলে গেলে তুমি তো অনেক উন্নত জীবন পেতে। কিন্তু যাওনি, এখানে এই মাটিতে এই বাতাসে তুমি থাকতে চেয়েছো। এখানেই থাকলে, এখানেই মরলে। মাতৃভূমি, রেডিও ভূমি এরপর মাটির ভূমি। সেখানেই তুমি ঘুমাও ভাই। তোমার আর কোনো দায়িত্ব নাই। আর আসতে হবে না দেশের একটি গণমাধ্যময়ে। আর ফিরতে হবে না ঘরে। আর কোনো টেনশন করতে হবে না। টাকার কথা ভাবতে হবে না। তোমার জীবন থেকে আমি শিখলাম, জীবন ছোট। এক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না। এক মুহূর্ত নিজেকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। জীবনের প্রয়োজনের যে টাকা, সেই টাকার জোগাড় অবশ্যই করে রাখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই। তোমার মতো সকলের প্রিয় আমি হতে পারব না। সেই সমর্থ্য আমার নাই। কিন্তু তোমার মতো নিজেকে কষ্ট আমি দেবো না। বুঝে গেছি ভাই। তুমি বুঝিয়ে গেছো, নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না।’
শামস সুমনকে ‘হিডেন সুপারস্টার’ সম্বোধন করে জয় আরও লিখেছেন, ‘সুমন ভাই, তোমার মৃত্যুর পর কিন্তু তুমি অনেক সম্মান পেয়েছো। ফেসবুক খোলা যাচ্ছে না, শুধু তোমার সংবাদ। তুমি না বলতে, তুমি খুবই অ্যাভারেজ; কিন্তু কই সুমন ভাই, আমার তো মনে হচ্ছে একজন সুপারস্টারের মৃত্যু হয়েছে। তুমি একজন হিডেন সুপারস্টার। তুমি বেঁচে থাকতে আমি তা বুঝিনাই। হে সুপারস্টার, মহান আল্লাহ তোমার আত্মাকে শান্তিতে রাখুক। ঘুমাইয়া থাকো ভাই। আরামে, নিশ্চিন্তে।’
সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের একটি গণমাধ্যময়ে শাহরিয়ার নাজিম জয়ের উপস্থাপনায় ‘১৩টি প্রশ্ন’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয় শামস সুমনের শেষ সাক্ষাৎকার। প্রয়াত বন্ধু ও সহকর্মীর প্রতি জয়ের এমন আবেগঘন চিঠি বিনোদন অঙ্গন ও অনুরাগী মহলকে করেছে আবেগাপ্লুত।
আরআই/টিকে