ইরান যুদ্ধে মোতায়েন ২ মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এখন কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৩৩ পিএম | ১৯ মার্চ, ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্র দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করে। এর মধ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন মোতায়েন করা হয় ইরানের দক্ষিণে আরব সাগরে। অন্যদিকে ইউএসএস জেরার্ল্ড আর ফোর্ড মোতায়েন করা হয় লোহিত সাগরে। তবে দ্বিতীয় রণতরীটি এই যুদ্ধে তেমন কাজে আসছে না বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকেরা।
হামলার পর হামলা চালিয়ে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে তটস্থ রেখেছে ইরান। আর একের পর এক দুর্ঘটনার জেরে অকেজো হয়ে পড়েছে ইউএসএস জেরার্ড ফোর্ড। এটি এখন মেরাতের জন্য ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের স্থাপনাগুলো প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।
ইরানের হামলায় ‘তটস্থ’ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন একটি নিমিৎজ শ্রেণির বিমানবাহী রণতরী। ওজন ১০০০০০ টন। এটি আদতে একটি ভাসমান বিমানঘাঁটির মতো। প্রায় ১ হাজার ৯২ ফুট দীর্ঘ এই জাহাজটিতে একসঙ্গে ৭০ থেকে ৯০টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার বহন করা সম্ভব।
উড্ডয়নের ডেকে স্টিম ক্যাটাপোল্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত গতিতে বিমান উৎক্ষেপণ করা যায়। বিমান অবতরণ করার জন্য বিশেষ একটি প্রযুক্তি অ্যারেস্টিং গিয়ার ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এফএ ১৮ সুপার হর্নেট, এফ ৩৫সি লাইটনিং, নজরদারি বিমান ও এমএইচ সিহক হেলিকপ্টার এতে মোতায়েন থাকে।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ইরানে গণবিক্ষোভের আশঙ্কা ছড়াতেই দক্ষিণ চীন সাগর থেকে যাত্রা শুরু করে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। এই রণতরীর সঙ্গী তিনটি আর্লে বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারও মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দেয়। এরপর তারা ইরান উপকূলের অদূরে ঘাঁটি গাড়ে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের সামরিক বাহিনী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন বিমানবাহী রণতরী লক্ষ্য করে এখন পর্যন্ত তিনটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সবশেষ গত বুধবার (১৮ মার্চ) রণতরীটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। তাদের দাবি, এই হামলার ফলে জাহাজটি এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তবে রণতরীটি এই মুহুর্তে ঠিক কোথায় অবস্থান করছে তা স্পষ্ট নয়।
আল মায়াদিনে প্রচারিত ইরানি বিবৃতি অনুযায়ী, উপকূলীয় অবস্থান থেকে সমুদ্রে থাকা ওই রণতরীর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় যা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপের জবাবের অংশ।
ইরান আরও জানায়, এর আগে গত ১৩ মার্চ এই রণতরীর ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। আইআরজিসি দাবি করে, তখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যৌথ হামলায় জাহাজটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরে যেতে বাধ্য হয়।
এর আগে আরও একবার রণতরীটি হামলার দাবি করে ইরান। সংঘাতের শুরুর দিকে (৫ মার্চ) দেশটির সেনাবাহিনীর খাতাম আল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স জানায়, ওমান সাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরীটি তাদের ড্রোন হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।
সংস্থাটির মুখপাত্র বলেছেন, রণতরীটি ওমান সাগরে ইরানের সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার দূরে এসে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল। তখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর তথা আইআরজিসির নৌবাহিনীর ড্রোন হামলায় রণতরীটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, হামলার পর রণতরীটি তার সঙ্গে থাকা ডেস্ট্রয়ারসহ দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যায় এবং এখন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম ও সম্পদ, বিশেষ করে বিমানবাহী রণতরীগুলো, তাদের প্রধান লক্ষ্য। যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অভিযানের অংশ।
অকেজো ইউএসএস জেরার্ল্ড আর ফোর্ড
এদিকে একটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের পর কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরার্ল্ড আর ফোর্ড। অগ্নিকাণ্ডের পর মেরামতের জন্য এটাকে এখন গ্রিসে ক্রিট দ্বীপে নেয়া হয়েছে। যদিও এটি যুদ্ধের জন্য ফিরতে পারবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। পারমাণবিক বিদ্যুৎচালিত রণতরীটিতে ৭৫টিরও বেশি যুদ্ধবিমান থাকতে পারে। যার মধ্যে এফ-১৮ সুপার হর্নেট এবং রাডার সংবলিত ই-২ হকআই বিমান অন্যতম। এর ক্রু সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে এটাকে লোহিত সাগরে মোতায়েন করা হয়।
তবে সম্প্রতি রণতরীটি একের পর এক দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে রণতরীটিতে ভয়াবহ আগুন লাগে এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘গত সপ্তাহে বিমানবাহী রণতরী জেরার্ল্ড আর ফোর্ডে আগুন নেভাতে নাবিকদের ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে এবং এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘সামরিক অভিযানে’র অংশ হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।’
এই ঘটনায় ৬০০-র বেশি নৌসদস্যের থাকার জায়গা সংকট দেখা দেয়। অনেককে মেঝে ও টেবিলে ঘুমাতে হয়। পাশাপাশি জাহাজের লন্ড্রি ও স্যানিটেশনসহ মৌলিক সেবাগুলোও ব্যাহত হয়। খবরে বলা হয়েছে, এই আগুনের ঘটনায় বহু নৌসদস্য এখন শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যায় ভুগেছেন।আর দুইজন ‘প্রাণঘাতী নয় এমন’ আঘাত পেয়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার ৫০০ নাবিক ও পাইলটসহ এই জাহাজটি ২৪ অক্টোবর ভূমধ্যসাগরে ছিল, যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এটিকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন-ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে।
তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা শুরুর পর জাহাজটিকে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএসএস জেরার্ল্ড আর ফোর্ড ১০ মাস ধরে সাগরে অবস্থান করছে। দীর্ঘ এই মোতায়েনের কারণে জাহাজ ও ক্রু উভয়ের ওপরই চাপ বাড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্রু সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের মোতায়েন সম্ভবত মে মাস পর্যন্ত বাড়ানো হবে। যদি তা হয়, তাহলে তারা প্রায় এক বছর সমুদ্রে থাকবে-যা একটি স্বাভাবিক বিমানবাহী রণতরীর মোতায়েন সময়ের প্রায় দ্বিগুণ।
এমআর/টিকে