ইরান ছেড়ে আজারবাইনে ১৮৬ বাংলাদেশি, আজ পৌঁছাতে পারেন দেশে
ছবি: সংগৃহীত
০৫:১৯ এএম | ২০ মার্চ, ২০২৬
বৃহস্পতিবার তেহরান সময় সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট যখন ঘড়ির কাঁটায়, তখন কথা হয়েছে তেহরান ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশিদের সঙ্গে। তারা সীমান্তে ইরানের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করে আজারবাইজানে প্রবেশ করেছেন। তারপর ওপারে অপেক্ষারত বাসে আসন নিয়েছেন। তবে আজারবাইজানে সবার ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এখনো রাজধানী বাকুর উদ্দেশে বাসযাত্রা শুরু হয়নি।
ওই বাংলাদেশি কাফেলাতে আমার প্রিয়জন ও আত্মজা রয়েছেন। ফোনে জানতে পারলাম খুব শিগগির বাস ছাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা গত বুধবার বিকেল ৪টায় তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে থেকে যাত্রা করেন এবং রাত ২টা নাগাদ আজারবাইজান সীমান্তে পৌঁছায়। তারপর অপেক্ষা কখন সকাল হবে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা নাগাদ ইমিগ্রেশনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM-International Organization for Migration) সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের অত্ত্বাবধানে ১৮৬ জন বাংলাদেশি কাফেলা স্বদেশে ফেরার জন্য এখন অপেক্ষার প্রহর গুণছেন।
বৃহস্পতিবার আজারবাইজান সময় বিকেল ৪টায় বাংলাদেশের বিশেষ চাটার্ড ফ্লাইট ছাড়ার কথা থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি। তবে তারা রাজধানী বাকুতে পৌঁছানোর পর জানা যাবে কখন ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে আকাশে উড়বে।
তেহরানের পরিস্থিতি : গতকাল বৃহস্পতিবার সবেমাত্র ইফতার শেষ হয়েছে। কোনো হামলার শব্দ শুনছি না। ইরানের ওপর ইসরায়েল-আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ১৮তম দিনের পরিস্থিতি অনেকটা ভালো। নিত্যদিনের মতো হামলা, পাল্টা হামলা ও প্রতিরোধের ঘটনা আবার কখন শুরু হবে বলা যাচ্ছ না। বুধবার দিবাগত রাতে হাতেগোনা কয়েকটা হামলার ঘটনা ঘটে তেহরানে।
বৃহস্পতিবার সারা দিন দুয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ ছাড়া পরিস্থিতি শান্ত। তেহরান সময় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা অব্দি অফিস করেছি। সাবওয়ে, বিআরটিসহ অন্যান্য পরিবহন শান্ত নগরিতে সাধারণভাবে চলাচল করতে দেখেছি। নগরবাসীকে তাদের নিত্যকাজে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে। গতকাল তেহরানে কোনো শোক মিছিল না দেখলেও বিভিন্ন প্রদেশে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের সচিব শহীদ ড. আলী লারিজানির জন্য শোক মিছিল হয়েছে।
তালিকা করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, শীর্ষ রাজনীতিক, সেনা ও নৌ কমান্ডারসহ শিশু শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষকে হত্যা এবং দক্ষিণ পার্স জ্বালানি স্থাপনায় হামলার চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি। ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাসুদ তেজেশকিয়ান তার এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া পোস্টে এসবের তীব্র নিন্দা ও প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলেছেন। ড. লারিজানিসহ সকল ইরানি নাগরিক হত্যার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও। আইআরজিসি আজ ‘ট্রু প্রমিজ-৪’-এর ৬৪তম তরঙ্গে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ ও ইসরায়েলে তীব্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার তীব্রতায় মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত আরব-আমিরাত ত্যাগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার তেহরানের ভালিয়ার্স স্কয়ারে নানা বয়সী ইরানি নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেছি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে। শীর্ষ নেতাদের হত্যার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন করেছি। তাদের উত্তরগুলো ছিল কাছাকাছি। কেউ কেউ বললেন, আমাদের রাহাবারকে হত্যা করে, শীর্ষ রাজনীতিক, সেনা ও নৌ কমান্ডারদের হত্যা করে যদি ইসরায়েল ভেবে থাকে ইরান হেরে গেছে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে- এর চেয়ে বড় মরিচিকা আর কিছু নেই। আমাদের প্রথম রাহাবার খোদা, তারপর প্রতিটি ইরানি এক-একজন খামেনি। শেষ ইরানির দেহে রক্তপ্রবাহ থাকা পর্যন্ত ইরানকে পরাজিত কিংবা ধ্বংস করা যাবে না। জুলুমবাজ, খুনি আমেরিকা ও ইসরায়েলকে অনুশোচনা করতে হবে। আমাদের রাহাবারকে হারিয়ে আমরা দুঃখিত। আমাদের হৃদয় ভেঙে গেছে। কিন্তু প্রতিশোধের শপথ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমরা স্থির হব না।
এসব কথা তারা যখন বলছিল তখন তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত ও কণ্ঠের দৃঢ়তা দেখেছি। একজন বললেন, আমি ইরানের ইসলামী শাসন কাঠামো পছন্দ করি না। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। কিন্তু আজ আমার মাটিতে রক্তের দাগ। আমাদের ইরানি ভাইদের হত্যা করা হয়েছে। আমি এর প্রতিশোধ নিতে চাই।
ইরানের মাটিকে যারা রক্তে রঞ্জিত করেছে সেই ইসরায়েল ও আমেরিকাকে ক্ষমা করা হবে না। ক্ষমা নেই দেশের অভ্যন্তরের মুনাফিকদের। আমি একজন ইরানি, আমাদের দেশই আমার কাছে সব। ইরানের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আছে। এসব মুছে ফেলা অসম্ভব।
আমি তাদের কথা শুনে ভাবতে থাকলাম, এই জাতিকে পরাজিত করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সকল মত ও পথের ঊর্ধ্বে ইরানিদের জাতীয়তাবাদ। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহুদূর যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
আইকে/টিকে