যুদ্ধের মধ্যেই ইরানিদের নওরোজ ও ঈদের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
১২:৪৮ পিএম | ২০ মার্চ, ২০২৬
শিয়া মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হবে আগামীকাল ২১ মার্চ। পবিত্র রমজান মাসের শেষ দিন হবে ২০ মার্চ। শুক্রবারের পরদিন থেকে শুরু হবে ঈদুল ফিতরের ছুটি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে এই খবর বলা হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কার্যালয় জানিয়েছে, ‘শুক্রবার হবে বরকতময় রমজান মাসের ৩০তম দিন এবং এর পরেই শুরু হবে ঈদুল ফিতরের ছুটি।’
এদিকে ইরাকের শীর্ষ শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলি আল-সিস্তানিও পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা করেছেন। সেখানেও শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ইরান এই যুদ্ধকে ‘রমজান যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে।
এই মাসে খামিনেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়। তিনি তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের শুরুতে একটি বিমান হামলায় নিহত হন।
কাকতলীয়ভাবে এ বছর রমজানের শেষ দিন পালিত হবে ফার্সি নববর্ষ বা ‘নওরোজ’।
এর আগে ইরানিরা সাধারণত খুব উৎসাহ নিয়ে প্রস্তুতি নিত নওরোজ উদযাপনে। তেহরানের কাছে দামাভান্দের পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী মিনা বলেন, ‘আমরা খুব ব্যস্ত থাকতাম এই দিনে। ঘর পরিষ্কার করা, নতুন কাপড় কেনা, মিষ্টি-নাস্তা কেনা। কিন্তু এ বছরটা একেবারেই আলাদা।’ কথাগুলো বলার সময় তিনি কাঁদছিলেন।
মিনা বলেন, ‘এ বছর প্রতিটা দিন অনেক লম্বা লাগে। মনে হয় সময়ই থেমে গেছে।’ নওরোজ মানে ‘নতুন দিন’। এটি একটি পুরোনো উৎসব। এটি বসন্তের শুরু, প্রকৃতির নতুন করে জেগে ওঠা এবং নতুন বছরের শুরু। এই উৎসবের ইতিহাস তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো।’ কিন্তু এ বছরের নওরোজ (২০ মার্চ) অনেকের জন্য যুদ্ধের মধ্যে প্রথম নওরোজ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা চলছে। মার্কিন সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান’ বলেছে, এতে তিন হাজার ১১৪ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে এক হাজার ৩৫৪ জন সাধারণ মানুষ আর অন্তত ২০৭ জন শিশু।
এর জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা করেছে। মিনার ছেলে আমির বলেন, ‘এই নওরোজ একেবারেই অন্যরকম লাগছে। যুদ্ধের কারণে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। আমি সবচেয়ে বেশি চিন্তিত দেশের অবকাঠামো নিয়ে। এভাবে চলতে থাকলে ইরানের কিছুই বাকি থাকবে না। আমি চাই না, এটাই আমাদের শেষ নওরোজ হোক।’
ইরানিদের কাছে নওরোজ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের অংশ। পার্সিয়ান, পারসি, কুর্দি, আর্মেনীয়, আজারবাইজানি, তাজিক, কাজাখ, উজবেকসহ অনেক জাতিগোষ্ঠী এই উৎসব উদযাপন করে। তবে সবার নিজস্ব কিছু রীতি রয়েছে।
এর আগে ইরানিরা সর্বশেষ যুদ্ধের সময় নওরোজ উদযাপন করেছিল ১৯৮০-এর দশকে। তখন ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধ চলছিল। নওরোজের আগে ঘরদোর ভালোভাবে পরিষ্কার করার একটি প্রথা আছে। এতে পুরোনো বছরের দুঃখ-কষ্ট দূর করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।
মিনা বলেন, ‘নতুন বছর শুরু হলে টিভিতে উৎসবের ঘোষণা শোনা যাবে, নাকি তার সঙ্গে মিসাইল আর ড্রোনের শব্দও থাকবে- আমি জানি না। তবে আমি আশা করি, এমনটা হবে না।’ নওরোজের দুই সপ্তাহের ছুটিতে সাধারণত পরিবার-পরিজনেরা একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায়।
কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। অনেকেই তেহরানে ফিরতে চান না, কারণ সেখানে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে। মিনা বলেন, ‘এ বছর দেখা-সাক্ষাৎ খুবই কম হচ্ছে। আমরাও তেহরান ছেড়ে একটু নিরাপদ জায়গায় চলে এসেছি।’
নওরোজের আগে ইরানের বাজার, শপিং সেন্টার ও রাস্তাঘাট সাধারণত ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট থাকে। কিন্তু এ বছর সেই উৎসবের আনন্দ ও কোলাহল অনেকটাই কমে গেছে।
তেহরানে বসবাসকারী ২০ বছরের এক তরুণী পারমিস বলেন, ‘আগে নওরোজের সব জিনিস কেনা অনেক সহজ ছিল। এখন কোথাও গেলে সব সময় ভয় থাকে, হঠাৎ বিমান হামলা হবে না তো?’
তিনি বলেন, ‘আমার মতো অনেকেই সবকিছুর মাঝেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। আমি যখন সেলুনে ছিলাম, তখন হঠাৎ বড় একটা বিস্ফোরণ হলো কিন্তু কেউ তেমন ভয় পায়নি।’
ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও আসন্ন নওরোজ ঘিরে মানুষের অনুভূতি ভিন্ন ভিন্ন রকমের দেখা যাচ্ছে। মরিয়ম নামে এক নারী বলেন, কিছু মানুষ এখনও উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী হাফ্ত সিন টেবিল সাজানোর জন্য বাজারে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, মানুষকে হাফ্ত সিনের জিনিসপত্র কিনতে দেখেছি, ফুল আর রাস্তায় বিক্রেতাও ছিল। কিন্তু আগের বছরের মতো পরিবেশ নেই।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘নওরোজ বছরে একবার আসে, তাই এটি উদযাপন করতেই হবে। আমি কিছু জিনিস কিনেছি, বাসাতেও কিছু আছে। কাল হাফ্ত সিন সাজানোর পরিকল্পনা করছি।’
সূত্র : বিবিসি, আরব নিউজ।
এসকে/টিকে