সুরের ডানায় এলআরবির ৩৫ বছর
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৩২ পিএম | ০৫ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে ব্যান্ডদল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ (এলআরবি) এক অনন্য নাম। আজ দলটির জন্মদিন। ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা এই ব্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলন তিন সদস্য হাবিব আনোয়ার জয়, শহীদুল ইসলাম টুটুল (এসআই টুটুল) ও সাইদুল হাসান স্বপন।
শুরুতে ব্যান্ডটির নাম ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, পরে আন্তর্জাতিক একটি ব্যান্ডের সঙ্গে নামের মিল থাকায় সেটিকে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড (এলআরবি)’ যদিও সংক্ষিপ্ত রূপ ‘এলআরবি’ নামেই তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার পরপরই এলআরবি তাদের সংগীতধারায় ভিন্নতা এনে দেয়। শুরুতে ইংরেজি গানের কভার করলেও খুব দ্রুত তারা নিজস্ব গান তৈরি শুরু করে। রক, হার্ড রক, সফট রক, ব্লুজ ও মেলোডির মিশেলে তৈরি তাদের গান শ্রোতাদের নতুন এক জগতে নিয়ে যায়। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাদের প্রথম ডাবল অ্যালবাম ছিল বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এক মাইলফলক। একই অ্যালবামে এত গান প্রকাশ সেই সময় ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
পরবর্তী সময় একের পর এক সফল অ্যালবাম ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘ফেরারি মন’, ‘স্বপ্ন’ শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে ‘চলো বদলে যাই’ গানটি আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমান জনপ্রিয়। এলআরবি শুধু স্টুডিও অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা বাংলাদেশের প্রথম লাইভ অ্যালবাম প্রকাশ করেও ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই ব্যান্ডের প্রাণ ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তিনি ছিলেন একাধারে ভোকালিস্ট, লিড গিটারিস্ট, গীতিকার ও সুরকার। তাঁর গিটারের সুর ও কণ্ঠ মিলেই তৈরি হয়েছিল এলআরবির স্বতন্ত্র পরিচয়।
দেশ-বিদেশের মঞ্চে পারফর্ম করে তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত করে তোলেন। এমনকি নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনেও পারফর্ম করার গৌরব অর্জন করে এই ব্যান্ড। তবে ২০১৮ সালে ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর আকস্মিক প্রয়াণ এলআরবির যাত্রায় বড় ধাক্কা হয়ে আসে। তাঁর অনুপস্থিতিতে ব্যান্ডটির কার্যক্রম কার্যত থমকে যায়। ধীরে ধীরে সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ কমে যায় এবং একসময় সবাই নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেকেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এলআরবি আর আগের মতো সক্রিয় নেই।
এর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কপিরাইট। আইয়ুব বাচ্চুর জীবদ্দশায় তাঁর গান ও ব্যান্ডের নাম নিবন্ধন করে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়– অনুমতি ছাড়া ‘এলআরবি’ নাম ব্যবহার করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। ফলে ব্যান্ডটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা আরও সীমিত হয়ে পড়ে। তবুও এলআরবি থেমে যায়নি, তাদের গান বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা এখনও তাদের গান গেয়ে মঞ্চ মাতান।

আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টিগুলো অনেকের কাছে শিক্ষার উৎস, অনুপ্রেরণার জায়গা। জন্মদিনকে ঘিরে এলআরবির দ্বিতীয় গিটারিস্ট আবদুল্লাহ আল মাসুদ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘সংগীত, আবেগ এবং ঐতিহ্যের ৩৫টি গৌরবময় বছর উদযাপনের এই মুহূর্তে লাভ রানস ব্লাইন্ড (এলআরবি)-এর অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত। এই যাত্রা শুধু সময়ের হিসাব নয়– এটি উৎসর্গ, অবিস্মরণীয় কিছু গান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্ত ও সংগীতশিল্পীদের সংযুক্তকারী এক বন্ধনের গল্প। এই কিংবদন্তি ব্যান্ডের সদস্য হওয়া সত্যিই এক পরম সম্মান এবং আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে এই গর্ব বহন করি। আমাদের তৈরি করা স্মৃতি এবং যে সংগীত আজও বেঁচে আছে, তার প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি। ঐতিহ্য অব্যাহত থাকবে।
২০০৩ সালে ব্যান্ড এলআরবিতে যোগ দেন মাসুদ। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। এলআরবির সদস্যদের আর এক প্ল্যাটফর্মে দেখা যাব কী না? এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বসের (আইয়ুব বাচ্চু) শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তাকে হারিয়ে আমার বিচ্ছিন্ন। অনেক দিন ধরেই সদস্যদের মধ্যে কারও সঙ্গে কারও নিয়মিত যোগাযোগ নেই। একেকজন একেক দিকে আছি। যদি কোনো বড় আয়োজন হয়, তাহলে হয়তো সবার আবার দেখা হবে। সেটা রিইউনিয়নের মাধ্যমই সম্ভব। এর বাইরে ব্যান্ডকে কেন্দ্র করে এক হওয়ার মতো কোনো বাস্তব উপলক্ষ্য দেখি না।’
এলআরবি ব্যান্ডের সাবেক কি-বোর্ডিস্ট ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এসআই টুটুল সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে লিখেন, ‘১৯৯১ সালের এই দিনে আমার বস আইয়ুব বাচ্চু, আমি, স্বপন ভাই এবং বন্ধু জয়, এই চারজন মিলে এই ব্যান্ডটি শুরু করেছিলাম। সে যে কত শত স্মৃতি! বলে শেষ করা যাবে না।’
এলআরবির ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দলটির ফেসবুক পেজে ভালোবাসা জানিয়ে লেখা হয়, ‘এলআরবির নামটি বাংলাদেশে রকসংগীতের ধারাকে নতুন রূপ দিয়েছে। চিরন্তন সুর থেকে শুরু করে শক্তিশালী গানের কথা পর্যন্ত এলআরবি শুধু একটি ব্যান্ড ছিল না। এটি ছিল একটি যাত্রা, একটি আবেগ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য একটি কণ্ঠস্বর। আয়ুব বাচ্চুর গড়া এই ঐতিহ্য আজও দেশের এবং দেশের বাইরের সংগীতশিল্পী ও শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ৩৫ বছরের সংগীত, স্মৃতি এবং মুহূর্ত যা আমাদের পরিচয় তৈরি করেছে। সেই রিফগুলোকে উৎসর্গ করা হলো, যা আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছে, সেই গানগুলোকে যা আমাদের সঙ্গে থেকে গেছে এবং সেই চেতনাকে যা আজও বেঁচে আছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।’
পিআর/এসএন