ঢাকায় ‘কিটামিন’ তৈরির ল্যাব, ৩ চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৩৯ পিএম | ০৭ এপ্রিল, ২০২৬
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবৈধভাবে ‘কিটামিন’ প্রস্তুতের একটি ল্যাব থেকে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তারা হলেন লি বিন (৫৯), ইয়াং চুংসেন (৬২) ও ইউ জি (৩৬)।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ডিএনসির সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। তিনি বলেন, চক্রটি ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে দেশ-বিদেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ ও সরবরাহ করত। তারা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনা করত।
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের বিষয়ে নজরদারি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৫ মার্চ রাজধানীতে একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান পরিচালনা করে একটি সন্দেহজনক পার্সেল জব্দ করা হয়। পরে পার্সেলটিতে তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয় এবং তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
উদ্ধারকৃত পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে আটক করা হয়।
ডিএনসির মহাপরিচালক আরো বলেন, অভিযানে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬.৩০০ কেজি কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য (সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহল), বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত থেকে প্রতীয়মান হয়, চক্রটি সুসংগঠিতভাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছে দাবি করে হাসান মারুফ বলেন, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করত এবং পরবর্তী সময়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করত।
তদন্তের অগ্রগতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে জানিয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ করত এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করত। তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করত।
অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে চক্রটি ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা মূলত টিআরওএন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা করত এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করত।
পরে তারা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ইউএসডিটি সমপরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করত, যা তাদের কার্যক্রমকে গোপন রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।
গ্রেপ্তার চীনা নাগরিকদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করত এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করত। এই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত থাকতে পারে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের পৃথক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব থাকতে পারে। বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব সহকারে তদন্তাধীন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখত। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে। তবে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও ধারাবাহিক গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম ধাপে ধাপে উন্মোচিত হচ্ছে।
মানবদেহে ‘কিটামিন’-এর ক্ষতিকর প্রভাব : কিটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্প মেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কেএন/এসএন