গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ জানলে চমকে যাবেন
ছবি: সংগৃহীত
০৩:৫১ এএম | ০৯ এপ্রিল, ২০২৬
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৩টা বাজে! অনেকের কাছেই এটা যেন নিয়মিত ঘটনা। ভাবছেন, শুধু আপনারই এমন হয়? মোটেও না। রাতের মাঝামাঝি ঘুম ভেঙে যাওয়া খুবই সাধারণ একটি বিষয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যান, তাদের ক্ষেত্রে রাত ৩টার সময়টি সাধারণত REM (Rapid Eye Movement) ঘুমের পর্যায়। এই সময় ঘুম তুলনামূলক হালকা থাকে, তাই সহজেই জেগে ওঠা সম্ভব।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কী কী কারণে আপনার ঘুম ভেঙে যেতে পারে-
বারবার বাথরুমে যাওয়া
ঘুমের মধ্যেও শরীর কাজ করে যায়, দিনভর খাওয়া-দাওয়ার প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। তাই মাঝে মাঝে বাথরুমের প্রয়োজন হওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি এটি নিয়মিত হয়ে যায়, তাহলে সেটি নকচুরিয়া-এর লক্ষণ হতে পারে।
কী করবেন?
ঘুমানোর আগে পানি বা তরল কম পান করুন। সমস্যা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আলোয় ঘুম ভাঙা
বাইরের স্ট্রিট লাইট বা ঘরের হালকা আলোও আপনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কারণ, আলো চোখের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে এটাকে ‘দিন’ মনে করায়। ফলে ঘুম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কী করবেন?
ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখুন, ব্ল্যাকআউট পর্দা বা স্লিপ মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
শব্দের বিরক্তি
রাতের নীরবতায় হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, পাশের বাসার টিভির শব্দ বা কারও কথা; এসবই ঘুম ভাঙার কারণ হতে পারে।
কী করবেন?
হোয়াইট নয়েজ/পিংক নয়েজ অ্যাপ বা ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করে পরিবেশ শান্ত রাখুন।
মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা
অনেক সময় বাইরের নয়, ভেতরের কারণেই ঘুম ভেঙে যায়-
১. স্ট্রেস : সারাদিনের চাপ মাথায় ঘুরতে থাকে।
২. অ্যাংজাইটি : অতিরিক্ত চিন্তা ঘুম ভেঙে দেয়।
৩. ডিপ্রেশন : ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়।
এই সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদি হলে ঘুমের রোগে পরিণত হতে পারে।
কী করবেন?
দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
দিনের বেলা ঘুমানো (ন্যাপ)
দুপুরের একটু ঘুম ভালো লাগলেও, এটি রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
কী করবেন?
সম্ভব হলে দিনের ঘুম এড়িয়ে চলুন। খুব প্রয়োজন হলে ২০ মিনিটের বেশি নয়।
শরীরের ব্যথা
ঘুমের ভঙ্গি বা শরীরের নানা সমস্যার কারণে রাতের বেলা ব্যথা বাড়তে পারে-
১. পিঠের ব্যথা
২. আর্থ্রাইটিস
৩. মাথাব্যথা
৪. মাসিকের ব্যথা
৫. মাংসপেশির টান
কী করবেন?
ঘুমের ভঙ্গি ঠিক করুন। সমস্যা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বয়স বাড়ার প্রভাব
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের ধরণ বদলে যায়। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের অর্ধেকের বেশি মানুষই কোনো না কোনো ঘুমের সমস্যায় ভোগেন।
কারণগুলোর মধ্যে আছে-
১. জীবনযাপনের পরিবর্তন (যেমন অবসর জীবন)
২. দীর্ঘমেয়াদি রোগ
৩. মানসিক সমস্যা
৪. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কী করবেন?
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত রুটিন মেনে চলুন।
অ্যালকোহল
অনেকে ভাবেন, অ্যালকোহল ঘুম আনতে সাহায্য করে। কিন্তু বাস্তবে এটি ঘুমের চক্রকে ভেঙে দেয়।
কী করবেন?
ঘুমানোর অন্তত ৩ ঘণ্টা আগে অ্যালকোহল গ্রহণ বন্ধ করুন।
ঘুমের রোগ
কখনও কখনও রাতের বেলা ঘুম ভাঙা বড় কোনো ঘুমের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে-
১. ইনসমনিয়া : ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা
২. স্লিপ অ্যাপনিয়া : ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া
৩. রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম : পায়ে অস্বস্তি, নড়াচড়ার তাগিদ
কী করবেন?
এসব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
‘রাত ৩টার রহস্য’- আসলে কি কিছু আছে?
অনেকে মনে করেন, রাত ৩টায় ঘুম ভাঙার পেছনে আধ্যাত্মিক কোনো কারণ আছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
একবার কোনো কারণে এই সময় ঘুম ভাঙলে শরীর সেটির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় ‘conditioning’।
ঘুম ভেঙে গেলে কী করবেন?
রাতের বেলা ঘুম ভেঙে গেলে ১৫-২০ মিনিট চেষ্টা করুন আবার ঘুমানোর, না পারলে বিছানা ছেড়ে উঠুন।
এরপর করতে পারেন-
১. মেডিটেশন
২. বিরক্তিকর/হালকা কিছু পড়া
৩. ক্যাফেইনবিহীন চা পান
৪. শান্ত গান শোনা
৫. গভীর শ্বাসের অনুশীলন
তবে মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার করবেন না, এগুলোর ব্লু লাইট মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তোলে।
শেষ কথা
রাত ৩টায় ঘুম ভেঙে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে যদি এটি নিয়মিত হয় বা আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে এটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। শরীরের সংকেতগুলো বুঝুন, জীবনযাত্রা ঠিক করুন, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন- তবেই মিলবে শান্তির ঘুম।
এসকে/টিএ