রাশিয়ার এক ঘোষণাতেই ভেস্তে যেতে পারে হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা!
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৪৭ পিএম | ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এক গভীর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ এবং চীনের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাশিয়ার প্রকাশ্য অঙ্গীকার- বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপ একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যার প্রভাব মার্কিন অর্থনীতি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে বর্তমানে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারছে না। গত সোমবার থেকে কার্যকর এই অবরোধ বাস্তবায়নে মার্কিন নৌবাহিনী ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানে ১৫টি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, যার মধ্যে একটি সুপার ক্যারিয়ার এবং ১১টি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার রয়েছে, পাশাপাশি কয়েক ডজন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ১০ হাজারের বেশি মার্কিন মেরিন ও এয়ারম্যান মোতায়েন করা হয়েছে।
সেন্টকম দাবি করেছে, ইতোমধ্যে অন্তত ছয়টি বড় মালবাহী জাহাজকে থামিয়ে তাদের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও একটি জাহাজ অবরোধ এড়িয়ে গেছে বলে গুঞ্জন উঠলেও, মার্কিন পক্ষের দাবি অনুযায়ী সেটি এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকে রয়েছে।
বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
চীন বর্তমানে ইরানি তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। বলা হয়, বেইজিংয়ের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইরান থেকে পূরণ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থান অনুযায়ী, চীন এখন আর ইরানি তেল আমদানি করতে পারবে না- যা বেইজিংকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলেছে।
এদিকে, চীনকে জ্বালানি সংকটে ফেলতে ওয়াশিংটনের এই কৌশলের মধ্যেই রাশিয়া নতুন অবস্থান নিয়েছে। বেইজিং সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন, মস্কো চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে সক্ষম এবং দুদেশের সম্পর্ক যেকোনো পরিস্থিতিতেই স্থিতিশীল থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই ঘোষণা চীনা বাজারে তাদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই নৌ অবরোধের লক্ষ্য শুধু ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
যদি এই কৌশল সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী হলে এর অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পরিবহন, পণ্যদ্রব্যের মূল্য এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতে। বিশেষ করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বাড়লে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর নজরদারি ও অভিযান, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আগামী দিনগুলোতে চীন-রাশিয়া জোটের অবস্থান এবং ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে এই সংকট কোন দিকে গড়াবে- বড় যুদ্ধের দিকে নাকি নতুন ভূরাজনৈতিক সমঝোতার দিকে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
এসকে/টিএ