© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

শেকড়ের টানে ফিরছে লেবাননের লাখো মানুষ

শেয়ার করুন:
শেকড়ের টানে ফিরছে লেবাননের লাখো মানুষ

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৮:৫৪ পিএম | ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
দক্ষিণ লেবানন থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়া শত শত মানুষের সাথে আমানি আত্রাশ ও তার পরিবারও শুক্রবার সকালে কাসমিয়েহ সেতু পুনরায় চালুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইসরায়েল এই সেতুতে বোমা হামলা চালিয়েছিল।

ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার মানুষের মধ্যে তার পরিবারও একটি, যারা নিজ বাড়িতে ফেরার আশায় বুক বেঁধেছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, লেবাননের কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী-যারা এখনও ওই এলাকার কিছু অংশ দখল করে আছে-তাদের পক্ষ থেকে দক্ষিণে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জারি করা সত্ত্বেও ঘরে ফিরতে মরিয়া এই মানুষগুলো।

যুদ্ধ শুরুর সময় উত্তর দিকে পালিয়ে যাওয়া ৩৭ বছর বয়সী আত্রাশ বলেন, আমরা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক ঘণ্টা আগে রওনা দিয়েছিলাম যাতে সেতুটি খোলার সাথে সাথেই আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারি এবং আমাদের শহরে ফিরে যেতে পারি।" উপকূলীয় শহর টায়ারের উত্তর-পূর্বে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনে গাড়িতে বসে এএফপিকে তিনি বলেন, "এই অপেক্ষা খুব কঠিন, কারণ আমরা যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছাতে চাই।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়। এই যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে ২ মার্চ শুরু হওয়া যুদ্ধের সাময়িক অবসান ঘটল। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোঁড়ার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা এবং দক্ষিণে স্থলপথে আগ্রাসন চালায়। লেবানন কর্তৃপক্ষের মতে, এই যুদ্ধে ২,১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আশা প্রকাশ করে আত্রাশ বলেন, আমাদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, এটি গর্ব ও বিজয়ের। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সেখানে ১০ কিলোমিটার "নিরাপত্তা বলয়" বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও আত্রাশ বলেন, কোনো ইসরায়েলি সেনাই আমাদের ভূমিতে থাকতে পারবে না, তাদের অবশ্যই প্রত্যাহার করতে হবে যাতে আমরা শান্তিতে বাঁচতে পারি। 

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে কাসমিয়েহ সেতুতে-লিটানি নদীর ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশ থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। লেবানন সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তিনটি বুলডোজার ভোরে বোমার সৃষ্ট গর্ত ভরাটের কাজ শুরু করে। রাস্তা চলাচলের উপযোগী হওয়ার সাথে সাথেই হিজবুল্লাহর হলুদ পতাকা উড়িয়ে এবং হর্ন বাজিয়ে উল্লাসের মধ্য দিয়ে গাড়ি ও মোটরসাইকেল পার হতে শুরু করে।

সকাল ৯টার মধ্যে সিডন এবং টায়ারের সংযোগকারী মহাসড়কে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। হাজার হাজার গাড়ি তোশক, রান্নাঘরের জিনিসপত্র এবং কম্বল নিয়ে দক্ষিণের দিকে ছুটতে থাকে।

গত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলার মুখে তড়িঘড়ি করে পালিয়ে আসা এই বাস্তুচ্যুত মানুষের অনেকেরই ধারণা নেই তাদের ঘরবাড়ির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। তাদেরই একজন গুফরান হামজেহ, যিনি ছেলের সাথে বৈরুত থেকে কাসমিয়েহ সেতুতে এসেছিলেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, যখন আমরা পালিয়েছিলাম, তখন রাস্তায় ১৬ ঘণ্টা সময় লেগেছিল, আজও একই অবস্থা। তবে সেটা কোনো ব্যাপার না। আসল কথা হলো আমরা আমাদের গ্রাম এবং আমাদের মাটিতে ফিরে যাচ্ছি।

"আমি জানি না আমার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে কি না, তিনি যোগ করেন। যদি ধ্বংস হয়েও থাকে, তাতে কিছু আসে যায় না, আমি এর সামনে একটি তাঁবু খাটাব এবং সেখানেই থাকব। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমরা আর কখনো আমাদের ভূমি ছাড়ব না।

কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে তিন সন্তানের বাবা মোহাম্মদ আবু রায়াও একই কথা জানান। তিনি বলেন, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও আমরা বিজয়ী হয়ে আমাদের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। আমরা আমাদের মাটিতেই থাকব, প্রয়োজনে ধ্বংসস্তূপের ওপর বসব। তবে দীর্ঘ এই বাস্তুচ্যুতির কারণে ক্ষোভও প্রকাশ করেন ৭৭ বছর বয়সী তামের আবদেললতিফ হামজা।

তিনি এএফপিকে বলেন, আমরা ১০ দিন ধরে সমুদ্র সৈকতে ঘুমিয়েছি। কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি, কেউ সাহায্য করেনি। আমাদের সব বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, আমাদের কিছুই অবশিষ্ট নেই।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা ৫০ দিন আগে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলাম। আজ আমাদের মনে হচ্ছে, আমরা ইসরায়েলের শত্রু হতে চাই না। আমরা এমন এক মূল্য চোকাচ্ছি যা আমাদের দেয়ার কথা নয়।


ইউটি/টিএ

মন্তব্য করুন