© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

সুন্দরবনে টিকে থাকা নিয়েই শঙ্কায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার

শেয়ার করুন:
সুন্দরবনে টিকে থাকা নিয়েই শঙ্কায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৫:৪৭ পিএম | ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে একসময় বাঘ ছিল মানুষের আতঙ্কের প্রতীক। বনজীবীরা বনে প্রবেশের আগে আত্মরক্ষায় বনবিবি কিংবা দক্ষিণ রায়ের আরাধনা করতেন। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাঘের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষই।

বাসস্থান ধ্বংস, চোরাশিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকট নিয়ে শুরু থেকেই কাজ করছেন স্থানীয়ভাবে ‘গণি টাইগার’ নামে পরিচিত আবদুল গণি গাজী। ৪৫ বছর বয়সী এই মানবাধিকার কর্মী দীর্ঘদিন ধরে বনসংলগ্ন মানুষের সঙ্গে বাঘের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

গণি গাজীর দাবি, এ পর্যন্ত তিনি বন্দুক ও ফাঁদ থেকে ৩৬টি বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করেছেন। পাশাপাশি বাঘের আক্রমণ থেকে ১০৬ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে বাঁচিয়েছেন। কখনও উত্তেজিত গ্রামবাসীকে বাঘ হত্যা থেকে বিরত রেখেছেন, আবার কখনও বাঘের আক্রমণে নিহত মানুষের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

তার ভাষায়, সুন্দরবন এবং এর ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বাঘকে বাঁচাতেই হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে বিস্তৃত ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বনাঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ বলেন, সুন্দরবনে একটি বাঘ মারা গেলেই পুরো বাস্তুসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতেও বাঘের গভীর প্রভাব রয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বনবিবির নাম স্মরণ করলে বনের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ৬৩ বছর বয়সী গ্রামবাসী আশুতোষ মন্ডল বলেন, বনবিবি তাদের বাঘ, সাপ ও কুমিরের হাত থেকে রক্ষা করেন।

২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার ঘোষণা দেয়। সে সময় বাঘের সংখ্যা প্রায় ৪১৪টি বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১০৬টিতে। পরে ২০১৮ সালে ১১৪ এবং ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘ শনাক্ত করা হয়। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র দুটি করে বাঘ বাড়ছে। এ ধীরগতির কারণে সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বাঘের আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে জীবিকার তাগিদে মানুষ আরও বেশি বনের ভেতরে প্রবেশ করছে। তিনি জানান, জোয়ারের সময় বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বনের ভেতরে মাটির কেল্লাও নির্মাণ করা হয়েছে।

বন ও বন্যপ্রাণী পাচার বিশেষজ্ঞ নাসির উদ্দিন বলেন, আইন ও শাস্তির ভয় উপেক্ষা করেই চোরাশিকারীরা বাঘ হত্যা করছে। বাঘের চামড়া, দাঁত ও হাড় ভারত, মিয়ানমার, চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। পাশাপাশি বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ শিকারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ১১ হাজার হরিণ অবৈধভাবে শিকার করা হয়। এতে খাদ্য সংকটে বাঘ লোকালয়ে চলে আসছে এবং মানুষ-বাঘ দ্বন্দ্ব আরও বাড়ছে।

তবে এত সংকটের মধ্যেও আশার কথা শুনিয়েছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ‘প্যানথেরা’র বিশেষজ্ঞ অভিষেক হরিহর। তার মতে, সত্তরের দশক থেকে শুরু হওয়া সংরক্ষণ কার্যক্রমের কারণেই সুন্দরবনের বাঘ পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনাও এখনও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এসএন

মন্তব্য করুন