১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধের দল’, প্রশ্ন আজহারের
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪২ পিএম | ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হতে পারে, সে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা হয়, বিএনপি দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের দল। অথচ বিএনপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, আর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ৭১ সালে; বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হতে পারে। তাহলে এটা কীভাবে আমি মূল্যায়ন করবো? বিএনপিতে মুক্তিযোদ্ধা আছে, এটা আপনি বলতে পারেন। তদ্রুপ জামায়াতে ইসলামীতেও মুক্তিযোদ্ধা আছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনাায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের ভাষণের পর ধন্যবাদ জানানোর জন্য আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ দেবো কীভাবে? এই প্রেসিডেন্ট কে? তিনি আওয়ামী লীগের দোসর। আওয়ামী লীগকে আমরা ফ্যাসিস্ট বলছি, আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট হওয়ার সুযোগ কীভাবে পেলো? আমাদের দেশের আইন আর ভারতের সরাসরি সহযোগিতায়। আজ সে আওয়ামী লীগ ভারতেই পালিয়ে গেছে। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগের তৈরি করা ফ্যাসিস্টের প্রেসিডেন্ট এবং সেই আওয়ামী লীগ যে ভারতীয় আধিপত্যের দোসর ছিল, সেই প্রেসিডেন্টকে আমি কীভাবে সমর্থন করতে পারি?
সেই ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দল কীভাবে ফ্যাসিস্টের দোসর রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানায়, সে প্রশ্ন তোলেন এটিএম আজহার। তিনি বলেন, তাহলে কি আমরা ধরে নেবো যে আপনারা কোনো ব্যক্তি, কোনো দল অথবা কোনো শক্তিকে খুশি করতে চান?
তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, আমি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বলতে চাই, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল, তাদের মহিলা নেত্রীরা রাজপথে আন্দোলন করেছে এবং তাদের অনেক ভূমিকা আছে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে, তাদের সংরক্ষিত নারী আসনে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদককে মনোনয়ন দিয়েছেন। কেন? এটা কি আপনাদের দৈন্যের কারণে? নাকি আপনারা কোনো শক্তিকে খুশি করতে চান, তাদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় থাকতে চান? সে প্রশ্নের জবাব আপনারা দেবেন। এ প্রশ্ন জনগণের সামনে আছে।
এদিকে বিভিন্ন স্থানে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করে ‘নিরাপত্তা কার্ড’ প্রবর্তনের ব্যবস্থা করতে বলেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি সরকারি দলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি আপনাদের হেয় করার জন্য কথা বলছি না, একবার চিন্তা করেন। দেশপ্রেমিক বলি আমরা, গণতান্ত্রিক শক্তি বলি আমরা, কিন্তু আজ আমরা এমপিরা স্বাধীনভাবে চলতে পারছি না। আজ আমাদের আক্রমণ করা হচ্ছে, অনেক কর্মীকে আক্রমণ করা হচ্ছে।’
জামায়াতের এই সদস্য বলেন, আমার এলাকার সরকারি কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে বিএনপির কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছি, এখনো ভয় দেখানো হচ্ছে। এজন্য অনেকে হাসতে হাসতে বলে, এত কার্ড পাইলাম, এখন ‘নিরাপত্তা কার্ড’র ব্যবস্থা করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এটিএম আজহারুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে কথা বলেন। আজহার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বিষয়টির উল্লেখ করেন।
আজহার বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলাম। যে কোনো মুহূর্তে আমার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হতো। ঠিক সেই মুহূর্তে ২৪ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লব বলি অথবা অভ্যত্থান করি, তার মাধ্যমে আমার মুক্তির পথ সুগম হয়। আমি এই জন্য জুলাইযোদ্ধা- যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখ করে আজহার বলেন, জুলাই আন্দোলন হঠাৎ করে হয়েছে এটা যেমন ঠিক নয়, তবে জুলাই আন্দোলন এত সরকার পরিবর্তনের জন্য হয়নি। একটা সরকার যাবে, আরেকটা সরকার আসবে- এ আন্দোলন তা ছিল না। একটা পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল। এই পরিবর্তন আন্দোলন ছিল বলেই আমাদের ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আমরা সুপারিশ দাঁড় করিয়েছিলাম, যার মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ ৭০ শতাংশ গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে আজহার বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া অমর হয়ে থাকবেন তিনটি কারণে। তিনি বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি ঐক্যের রাজনীতি করেছিলেন এবং তিনি আধিপত্যবাদবিরোধী ছিলেন। তার ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ আধিপত্যবাদমুক্ত হয়। বেগম খালেদা জিয়া অমর হয়ে থাকবেন। তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি জনগণের কাছে খেতাব পেয়েছেন আপসহীন নেত্রী। তিনিও ঐক্যের রাজনীতি করেছেন।
এটিএম আজহার বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে ১৬ বছরে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি কেউ নির্যাতনের শিকার হয়নি। আর কোনো দলের প্রধান নেতা, সেক্রেটারি জেনারেল থেকে শুরু করে ১১ জনকে জেলখানায় ফাঁসি দিয়ে এবং বিনাচিকিৎসায় হত্যা করা হয়।
আজহারুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামী প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশের জনগণকে ভালোবাসে। তারা ভয় করে জীবন রক্ষা করার জন্য সুন্দর জীবনযাপন করার জন্য কোনো সময় দেশ থেকে পালিয়ে যায়নি। ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন শহীদ হয়েছেন, দেশ তো ছাড়েন নাই। এদেশের জনগণ জানেন কারা ত্যাগ বেশি স্বীকার করেছে। আমি কারও ত্যাগকে অস্বীকার করি না, ছোট করে দেখতে চাই না। এমন কথা বলবেন না যেটা জনগণ বিশ্বাস করে না এবং আমাদের মনে আঘাত সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, আপনি একদিকে ঐক্যের কথা বলবেন, আবার ঐক্য বিনিষ্ট হয়, জাতীয় সংসদে এ ধরনের কথাও বলবেন। আর পরবর্তীসময় আমাদের নসিহত করবেন যে আপনি এমন কথা বলেন কেন, যেটাতে ঐক্য নষ্ট হবে। আমরা তো শহীদ জিয়া, বেগম জিয়ার মুখে এমন কথা শুনিনি। আপনারা কি অস্বীকার করবেন? নিজামী সাহেবসহ আমরা যখন গ্রেফতার ছিলাম, আমাদের মুক্তির দাবি বেগম খালেদা জিয়া করেছিলেন।
তাহলে কি আপনি বলবেন, উনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে বা দলগুলো, লোকগুলোর মুক্তির আন্দোলন করেছিলেন। কারণ উনি ঐক্যের রাজনীতি চেয়েছেন। দেশকে গঠন করতে হলে বিভক্ত রাজনীতির মাধ্যমে কোনো দেশ কোনোভাবেই এগিয়ে যেতে পারে না । কিন্তু সেটাই দেখতে পাচ্ছি।
আরআই/টিএ