ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর
ছবি: সংগৃহীত
০১:৩৭ পিএম | ০৫ মে, ২০২৬
ইন্দোনেশিয়া ও জাপান গতকাল একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটির উদ্দেশ্য হলো যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এর ফলে ইন্দোনেশিয়ার জন্য জাপানি সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়েছে।
জাকার্তায় ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শাফরি শামসুদ্দিন এবং তার জাপানি প্রতিপক্ষ কোইজুমি শিনজিরো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং উভয়েই এটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে শাফরি বলেন, ‘আমরা উভয়েই নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আমাদের জনবলের উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছি।’
কোইজুমি বলেন, ‘উভয় দেশই সমুদ্র তীরবর্তী রাষ্ট্র এবং একই মূল্যবোধ ধারণ করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তাদের এই সহযোগিতা শুধু আমাদের দেশেই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবে।’
নিক্কেই এশিয়ার তথ্য অনুযায়ী কোইজুমি আরো বলেন ‘আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সহযোগিতা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ নিজ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশটির উল্লেখযোগ্য প্রভাব ও দায়িত্ব রয়েছে।’
কোইজুমি জানান, মন্ত্রীরা একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেছেন যেখানে তারা যৌথ সামরিক মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তায় আরো সহযোগিতা এবং সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
চুক্তির খসড়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং কোইজুমি এক্স-এ একটি পোস্টে বলেছেন, ‘আমি বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না।’ তবে দুই মন্ত্রী বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দেশ দুটি ‘ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স ডায়ালগ মেকানিজম’ নামে একটি সংলাপের কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে। এটি উভয় পক্ষের উপমন্ত্রী পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
জাকার্তা ও টোকিও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা-বেচায় সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য তারা একটি যৌথ কর্মদল (ওয়ার্কিং গ্রুপ) গঠন করবে। এই চুক্তিটি হয়েছে জাপানের একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের পর। যুদ্ধের পর থেকে জাপানের সংবিধানে শান্তির ওপর জোর দেওয়া ছিল এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানি নিষিদ্ধ রেখেছিল। এখন সেই নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
ফলে জাপান এখন পাঁচ ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছে বিক্রি করতে পারবে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম হস্তান্তরের চুক্তি আছে।
এর ফলে টোকিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতিরক্ষা শিল্পের এক ক্রমবর্ধমান সক্রিয় অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে, যেখানে বেশ কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন, চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক প্রভাব নিয়ে জাপানের মতোই উদ্বিগ্ন। জাপান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অস্ত্র বিক্রি পুনরায় শুরু করার উদ্দেশ্য হলো মিত্র এবং অন্যান্য সমমনা দেশগুলোর প্রতিরক্ষাকে সমর্থন করা।
ইন্দোনেশিয়া অনেক দিক থেকেই জাপানের অস্ত্র কেনার জন্য একটি স্বাভাবিক বা উপযুক্ত ক্রেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তোর নেতৃত্বে দেশটি বড় ধরনের সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচি চালাচ্ছে। ২০২৬ সালে এই খাতে প্রায় ৩৩৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়া (প্রায় ১৯.৪ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ থেকে যুদ্ধবিমানসহ সামরিক সরঞ্জাম কেনারও চেষ্টা করছে। তবে তারা কোনো একক দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে চায় না। তাই ইন্দোনেশিয়া একটি বৈচিত্র্যময় অস্ত্র কেনার নীতি অনুসরণ করছে। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখছে। এমনকি সম্প্রতি চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার কথাও বিবেচনায় এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাপানকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তাই ইন্দোনেশিয়া ঠিক কী কিনবে তা নিশ্চিত নয়। তবে আগে তারা জাপানের ব্যবহৃত ওয়াইশিও-শ্রেণির সাবমেরিন কেনার আগ্রহ দেখিয়েছিল। নতুন এই চুক্তির ফলে এখন ইন্দোনেশিয়ার কাছে সামরিক আধুনিকায়নের জন্য আরো একটি বিকল্প যুক্ত হলো।
এমআর/এসএন