জেফরি এপস্টিনের কথিত ‘সুইসাইড নোট’ প্রকাশ
ছবি: সংগৃহীত
১২:২০ পিএম | ০৭ মে, ২০২৬
যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের কথিত একটি ‘সুইসাইড নোট’ গত বুধবার জনসমক্ষে এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। তবে এই নথির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং এতে কোনো তারিখও উল্লেখ নেই।
প্রয়াত এই যৌন অপরাধীর এক সাবেক কারাসঙ্গী দাবি করেছেন যে, তিনি এই চিরকুটটি খুঁজে পেয়েছিলেন। এরপরই আদালতের নথিতে এটি যুক্ত করা হয়।
স্বাক্ষরবিহীন ওই চিরকুটে লেখা ছিল- তারা কয়েক মাস ধরে আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে-কিন্তু কিছুই পায়নি!!!
এতে আরও লেখা ছিল, বিদায় বলার জন্য নিজের সময় নিজে বেছে নিতে পারাটা ভাগ্যের বিষয়।
সাবেক ওই কারাসঙ্গী জানান, ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এপস্টিন একবার আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন, সেই সময়ের চিরকুট এটি। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই যৌন পাচারের মামলায় বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় কারাগারে নিজের সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। সে সময় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
কিছুদিন আগেই মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন সংক্রান্ত কয়েক মিলিয়ন নথি অবমুক্ত করার কথা জানিয়েছিল। এরপরই আদালতের পক্ষ থেকে এই নথি প্রকাশের বিষয়টি এমন এলো।
এই কথিত সুইসাইড নোটের অস্তিত্বের কথা প্রথম সামনে আনে নিউইয়র্ক টাইমস। গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, প্রায় সাত বছর ধরে এই চিরকুটটি জনসমক্ষ থেকে আড়ালে রাখা হয়েছিল। টাইমস-এর পক্ষ থেকে ডিস্ট্রিক্ট বিচারক কেনেথ কারাসের কাছে এই চিরকুটসহ ওই কারাসঙ্গীর মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথি জনসমক্ষে প্রকাশের আবেদন জানানো হয়েছিল। বিচার বিভাগও স্বচ্ছতার স্বার্থে এই আবেদনের কোনো বিরোধিতা করেনি।
গত সোমবার বিচারক কারাসের কাছে লেখা এক চিঠিতে বিচার বিভাগ জানায়, “এপস্টিনের মৃত্যুর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই চিরকুটের বিষয়বস্তু বা এর সত্যতা সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তাই বিষয়টি আদালতের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো।” তাদের এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কথিত এই চিরকুটটি আসলেও বৈধ কি না, সে বিষয়ে বিচার বিভাগ নিশ্চিত নয়।
এ বিষয়ে সিএনএনের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের (ডিওজে) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কথিত এই চিরকুটটি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রথম খুঁজে পান এপস্টিনের কারাসঙ্গী নিকোলাস তারতাগলিওন। সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা চারটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে ছিলেন। তারতাগলিওন দাবি করেছিলেন, প্রথমবার আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার সময় তিনি এপস্টিনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। সে সময় একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ঘটনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছিল, ম্যানহাটনের জেলখানায় এপস্টিনের গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল।
গত বছর লেখক ও ইনফ্লুয়েন্সার জেসিকা রিড ক্রাউসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারতাগলিওন বলেন, “জেফরি এপস্টিন যখন আমার সঙ্গে একই সেলে ছিলেন, তখন তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আমি জেগে উঠে সিপিআর দিয়ে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনি। আর এই ঘটনার প্রমাণ হিসেবেই এপস্টিন একটি সুইসাইড নোট লিখেছিলেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “চিরকুটটি আমার বইয়ের ভেতরে ছিল। আমি সেলে ফিরে যখন পড়ার জন্য বইটা খুলি, তখন ওটা দেখতে পাই। তিনি (এপস্টিন) ওটা লিখে বইয়ের ভেতরে গুঁজে রেখেছিলেন।”
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারতাগলিওন দাবি করেছেন যে তার আইনজীবীরা হস্তলিপি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে চিরকুটটির সত্যতা যাচাই করিয়ে নিয়েছেন।
গত মাসের শেষের দিকে বিচারকের কাছে চিরকুটটি জনসমক্ষে প্রকাশের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস এই বক্তব্যগুলো তুলে ধরেছিল।
তবে এপস্টিনের প্রথমবার আত্মহত্যার চেষ্টার বিষয়টি নিয়ে এখনো রহস্য রয়ে গেছে।
২০১৯ সালের জুলাই মাসে কারাকর্তৃপক্ষের কাছে এটি স্পষ্ট ছিল না যে, এপস্টিনের ওই আঘাতগুলো কি তিনি নিজে নিজেই করেছিলেন নাকি অন্য কেউ তাকে আক্রমণ করেছিল। সে সময় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছিল, এপস্টিনের সেই আঘাতগুলো খুব একটা গুরুতর ছিল না। তবে এপস্টিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে, তাকে মারধর করা হয়েছে এবং ‘শিশু যৌন নিপীড়ক’ বলে গালি দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এপস্টিন তার কারাসঙ্গী তারতাগলিওনের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ আনলেও পরে তিনি সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। প্রকাশিত ‘পোস্ট সুইসাইড ওয়াচ রিপোর্ট’ শীর্ষক একটি নথি অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক দিন পর এপস্টাইন কারাগারের এক মনোবিদকে জানান যে, তারতাগলিওন তাকে কোনো হুমকি দেননি এবং ওই ঘটনার কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই।
অবমুক্ত করা নথিতে অন্তর্ভুক্ত ওই ঘটনার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপস্টিনকে কারাকক্ষের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং তার গলায় একটি হাতে তৈরি ফাঁস লাগানো ছিল।
মনোবিদের ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, কথিত আত্মহত্যার চেষ্টার পরদিন অর্থাৎ ২৪ জুলাই এপস্টিন বলেছিলেন, নিজের জীবন শেষ করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।
পরের দিন এক পরীক্ষার সময় তিনি আবারও একই কথা বলেন। রিপোর্টে বলা হয়, মনোবিদের কাছে এপস্টিন দাবি করেছিলেন, আমি মামলার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমার নিজস্ব জীবন আছে এবং আমি সেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চাই।
এরপর জেফরি এপস্টিনকে মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারের সুইসাইড ওয়াচ-এ (বিশেষ নজরদারি) রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই কারাগারেই তিনি আত্মহত্যা করেন। তবে তার এই মৃত্যুকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ডালপালা মেলতে শুরু করে। অনেকেরই প্রশ্ন ছিল, তিনি কি আসলেই আত্মহত্যা করেছেন নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে।
অবশ্য গত বছর মার্কিন বিচার বিভাগ এক মেমোতে জানিয়েছে, এপস্টাইনকে হত্যা করার মতো কোনো প্রমাণ মেলেনি। এ ছাড়া কারাগারের ১০ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজও প্রকাশ করেছে বিভাগটি, যেখানে দেখা যায় যে দিন তিনি মারা যান, সেদিন তার কারাকক্ষে কেউ প্রবেশ করেনি।
সূত্র : সিএনএন।
কেএন/এসএন