© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

শেখ হাসিনার আমলে ডন সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ততটা ছিল না: গোলাম মাওলা রনি

শেয়ার করুন:
শেখ হাসিনার আমলে ডন সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ততটা ছিল না: গোলাম মাওলা রনি

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৯:৩৮ এএম | ১৪ মে, ২০২৬
শেখ হাসিনার আমলে প্রকাশ্য ডনগিরি ছিল না; চাঁদাবাজি ছিল, কিন্তু সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটভিত্তিক ডন সংস্কৃতি ততটা ছিল না। এখন সেই ডনগিরি আবার ফিরে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি।

তিনি বলেন, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। আজ দেশে যে নানা ধরনের অন্যায় দেখা যাচ্ছে, তার অনেক কিছুর শুরু হয়েছিল সেই সময় থেকেই। আন্ডারওয়ার্ল্ডের কালা জাহাঙ্গীর, ডাকাত শহীদ, ডেভিডসহ আরো অনেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন তখন সক্রিয় ছিল। তারা এখন আবার নতুনভাবে ফিরে এসেছে।

সম্প্রতিক এক ভিডিওতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
 
গোলাম মাওলা রনি বলেন, সেই সময়েই প্রথম ব্যাংকপাড়াকেন্দ্রিকভাবে বাকের নামে একজন সিবিএ নেতা তৈরি হয়েছিল। সমস্ত ব্যাংকপাড়াজুড়ে ছিল তার দাপট। কে এমডি, কে চেয়ারম্যান- এসব কোনো বিষয়ই ছিল না; বাকের যা বলত, সেটাই হতো।

সেই বাকের এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু আজ পুরো আর্থিক খাতে হাজারো ‘বাকের’ দানবের মতো আবির্ভূত হয়েছে। কোনো একটি সরকারি ব্যাংকের সিবিএ নেতা, ডিএমডি বা জিএম- যে-ই হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে একেকজন নিজেদের ব্যাংকের ‘বাকের ভাই’ হয়ে উঠেছে এবং পুরো আর্থিক খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনূস সরকারের আমলে যে  ‘মব কালচার’ তৈরি হয়েছে, সেটি এখন আরো বেড়েছে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি- সব ক্ষেত্রেই এখন তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে: প্রথমত টাকা, দ্বিতীয়ত অযোগ্যতা, তৃতীয়ত আনুগত্য।

এই তিনটি বিষয় ছাড়া কোনো কর্মকর্তা সামনে এগোতে পারছেন না- ব্যাংক ও বীমাসহ পুরো আর্থিক খাতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফলে যা হওয়ার, তাই হচ্ছে।
 
‘সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য এখন মানুষের সামনে এলে তা গুরুত্ব পাওয়ার বদলে ট্রল হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। নেতিবাচক অর্থে, ঠাট্টা-বিদ্রূপের উপকরণ হিসেবেই সেগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের কোনো মন্ত্রী বা এমপির গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেশের গণমাধ্যম ও জনগণের মধ্যে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে- গত দুই মাসে এমন একটি ঘটনাও দেখা যায়নি।’

গোলাম মাওলা রনি বলেন,  ইউনূস সরকারের সময় প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম, আলী রীয়াজ, বদিউল আলম মজুমদারদের বক্তব্য যেভাবে মিডিয়ায় উপস্থাপন করা হতো, তা অনেক সময় মানুষের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াত। যেন উদ্দেশ্যই ছিল- মানুষ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হোক, তাদের কথা শুনে বিরক্ত হোক এবং শেষ পর্যন্ত ইউনূস সাহেবের প্রতিও মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হোক।
 
তিনি বলেন, বর্তমান সময়েও একই ঘটনা ঘটছে। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্য মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে- কখনো সরাসরি, কখনো অত্যন্ত কৌশলী ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভঙ্গিতে- যেন শেষ পর্যন্ত সেগুলো ট্রলের শিকার হয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে সরকারটি দুর্বল, ফাঁপা এবং কার্যকর ক্ষমতাহীন; আর সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে, এবং মূলত তার বক্তব্যই মিডিয়ায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের লোকজন অনেকে দূরে সরে গেছেন, অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ আত্মগোপনে, আবার অনেককে চাকরি থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেই জায়গাগুলো দখল নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। কিছু কিছু পদ-পদবি তো রীতিমতো ‘টেন্ডার’ হয়ে গেছে- কে কত যোগ্য, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কে কত টাকা দিতে পারে এবং কার কত শক্তিশালী লবি রয়েছে।

তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত বিস্ময়কর কিছু নিয়োগও হয়েছে। দেখা গেছে, কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থেকেও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে গেছেন। আবার অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা, যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তারাও এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। এর ফলে পুরো প্রশাসনযন্ত্রে যে গতি, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন ছিল এবং জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে কার্যকরভাবে কাজ করার কথা ছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়েছে। তাই যত বড় বড় কথাই বলা হোক না কেন, সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না।
 
তিনি আরো বলেন, জনগণ যখন সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সরকারের রাজস্ব আদায়ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভ্যাট আদায়ের জন্য কর্মকর্তারা মাঠে গেলে জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আসলে প্রকৃত কর্মকর্তা ছিলেন না বরং ভুয়া পরিচয়ে গিয়েছিলেন, তাকেও জনতা ধরে বেদম মারধর করেছে।

গোলাম মাওলা রনি বরেন, যেভাবে পুলিশকে টানিয়ে রাখা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই তাকেও টানিয়ে রাখা হয়েছে। মারধর করে তার গালের চেহারাটাই বদলে দেওয়া হয়েছে। সরকার নিজেদের সম্মান বাঁচানোর জন্য বলছে, তিনি নাকি ভুয়া ভ্যাট কর্মকর্তা। কিন্তু তিনি ভুয়া না হয়ে যদি সত্যিকারের ভ্যাট কর্মকর্তা হতেন, তাহলেও ভ্যাট কর্মকর্তাদের সম্পর্কে মানুষের ক্ষোভ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, পরিস্থিতি এর বাইরে যেত না।
 
এভাবে আয়কর বিভাগ, কাস্টমস, পুলিশ- সব ক্ষেত্রেই যখন মানুষের রাগ ও ক্ষোভ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তখন এই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা সরকারের হাতে আর থাকবে না। এসব পরিস্থিতি মূলত তৈরি হয়েছে দলবাজি ও নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে। এর জন্য শুধু একজনকে দায়ী করা যাবে না। অতীতে যারা এসব করেছে, পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা দলবাজি কমানোর বদলে বরং আরো বাড়িয়েছে।

কেএন/এসএন

মন্তব্য করুন