পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার হলেন রথীন্দ্রনাথ বসু, প্রথম দিনেই হট্টগোল বিরোধীদের
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৪৫ পিএম | ১৫ মে, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক রথীন্দ্রনাথ বসু। শুক্রবার (১৪ মে) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার নাম প্রস্তাব করেন। এরপর কণ্ঠ ভোটে স্পিকার নির্বাচনে জয়ী হন রথীন্দ্র। নতুন স্পিকারকে স্বাগত জানান প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়।
অষ্টাদশ বিধানসভার স্পিকার পদের জন্য বৃহস্পতিবারই মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন রথীন্দ্রনাথ। তার প্রস্তাবক ছিলেন বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ, দীপক বর্মণ এবং অগ্নিমিত্রা পাল। সমর্থক ছিলেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, বিশাল লামা ও মালতী রাভা রায়। সংঘের সঙ্গে সম্পৃক্ত, পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট রথীন্দ্রনাথ উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে পরিচিত নাম। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা তৈরির পরে এই প্রথম উত্তরবঙ্গ থেকে কেউ স্পিকার হলেন।
রথীন্দ্রনাথ স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পরেই সভার নিয়ম মেনে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রথমে বলার অনুমতি দেন স্পিকার। বিধানসভায় বক্তৃতা করতে উঠে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গঠনমূলক বিরোধিতা চাই। বিধানসভা মারামারির জায়গা নয়। সংবিধানের পরিভাষায় House belongs to the Opposition।’ বিধানসভায় সরকার এবং বিরোধী পক্ষ ৫০-৫০ ভাগে বক্তৃতার সুযোগ পাবে বলেই আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর পর নতুন স্পিকারকে স্বাগত জানিয়ে বক্তৃতা করেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তার বক্তৃতায় উঠে এসেছে ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগের প্রসঙ্গ। শোভনদেব বলেন, ‘আপনারা বলেছিলেন, ভয় চলে যাবে, ভরসা আসবে। আজকে ভরসা নেই, কিন্তু ভয় চার গুণ বেড়ে গিয়েছে। বহু মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। আজ আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করব এবং স্পিকারের মাধ্যমে সবার কাছে অনুরোধ করব, যখন কথা দিয়েছিলেন ভয় নয় ভরসা, আজ সেই ব্যবস্থা করুন। যাতে মানুষ তার নিজের ঘরে ফিরতে পারে। আজকে এসআইআর থেকে শুরু করে ভোট গণনা পর্যন্ত যেভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়া হয়েছে, আমার মনে হচ্ছে যেন এক স্বেচ্ছাচারী শাসকের পদধ্বনি শুনছি।’
বিরোধী দলনেতার বক্তৃতার পর পাল্টা জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। বলেন ‘কেউ ঘরছাড়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ভোট পরবর্তী হিংসায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, তারা যদি ঘরছাড়া হয়ে থাকেন তবে, পুলিশ নিজে তাদের সবাইকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দেবে। কিন্তু ২০১১-এর ভোট পরবর্তী হিংসার সঙ্গে যাদের যোগ আছে তারা গ্রেপ্তার হবেন, জেলে যাবেন।’
তারপর একে একে বক্তৃতা করেন বিজেপি বিধায়ক তথা প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এবং আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। নওশাদ সিদ্দিকি বিধানসভায় ভোট-পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ তোলেন। রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে জেতার পর আমার মনে হয়েছিল ৬ মাসে ইস্তফা দিয়ে দিই, তাতে যদি আমরা আমাদের কর্মীদের বাঁচাতে পারি।’
বিরোধী দলনেতাকে উদ্দেশ্য করে তাপস রায় বলেন, ‘অতীতে বিজেপি প্রার্থীদের হাড়গোড় ভেঙে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল। আজ পোস্ট পোল ভায়োলেন্সের কথা এদের মুখে আসে! নির্লজ্জ, বেহায়া না হলে পোস্ট পোল ভায়োলেন্সের কথা বলে এরা?’ তৃণমূলকে কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন, ‘আজ বিজেপি কর্মীদের ১৫০-২০০ লাশ গুনতে হত, যদি এরা আবার সরকারে ফিরে আসত।’
তবে এদিন অধিবেশন শুরুর আগেই বিজেপি ও তৃণমূল বিধায়কদের স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে রীতিমতো উত্তেজক চেহারা নেয় বিধানসভা কক্ষ। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের এক পর্যায়ে স্পিকার নির্বাচন শুরুর আগেই কক্ষ ত্যাগ করে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়করা।
এদিন অধিবেশন শুরু হতেই ট্রেজারি বেঞ্চ তথা শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে ‘ভারত মাতা কী জয়’ স্লোগান উঠতে থাকে। পাল্টায় বিরোধী বেঞ্চ থেকে তৃণমূল বিধায়করা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয় যখন বিজেপি বিধায়করা ‘চোর চোর’ এবং ‘ফাইল চোর মমতা’ স্লোগান তুলে আক্রমণ করে। পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে তৃণমূল বিধায়করা সিএস-কে ব্যবহার করে ‘ভোট লুটের’ অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে থাকেন।
এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেই স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে তৃণমূল বিধায়করা একযোগে কক্ষ ত্যাগ করেন। ফলে নির্বাচনের সময় বিধানসভা কক্ষ বিরোধীশূন্য হয়ে পড়ে। তৃণমূল অভিযোগ তুলেছিল, জাতীয় সঙ্গীত ঠিকমতো গাওয়া হয়নি। যদিও কয়েক মিনিট পর ফের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন দলের বিধায়করা। এত কিছুর মধ্যেই অধিবেশন কক্ষে স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায় সরকার পক্ষ।
এমআই/টিকে