মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জাদুঘর থেকে অপসারণ
ছবি: সংগৃহীত
০৭:০১ পিএম | ১৮ মে, ২০২৬
১৮ মে। আজ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস।
এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য— ‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’। এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। অথচ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রাক্কালে সেই জাদুঘরকে ঘিরেই উঠেছে ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপনা, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বলে দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়।
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের কর্নারে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কার্যক্রম আগের মতো নেই।
এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য— ‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’। এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। অথচ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রাক্কালে সেই জাদুঘরকে ঘিরেই উঠেছে ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপনা, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বলে দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়।
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের কর্নারে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কার্যক্রম আগের মতো নেই। ১৯১৩ সালে ‘ঢাকা জাদুঘর’ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাদুঘর। ৯৩ হাজার ২৪৬টি নিবন্ধিত নিদর্শনের বিপরীতে চারতলা ভবনের ৪৬টি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ১৭৮টি নিদর্শন। অর্থাৎ মোট সংগ্রহের প্রায় ৫ শতাংশ। বাকি বিপুলসংখ্যক নিদর্শন স্টোরে সংরক্ষিত আছে।
রবিবার (১৭ মে) জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করা কয়েকজন দর্শনার্থীর সঙ্গে কথা হয়। জাদুঘর পরিদর্শন করে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ স্মৃতিচিহ্নের উপস্থাপনা দেখে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা। জাদুঘর ভবনটির তৃতীয় তলায় রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে স্থাপিত কর্নার। তবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই ভবনে থাকা আলাদা গ্যালারি অপসারণ, মুক্তিযুদ্ধের কর্নারে আগের তুলনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে দৃশ্যমান উপস্থাপনা কমে যাওয়া নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন কিছু দর্শনার্থী।
পরিবার নিয়ে জাদুঘরে আসা যাত্রাবাড়ীর দর্শনার্থী রায়হান কবীর বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আগের মতো আলাদা কর্নার বা গ্যালারি তিনি খুঁজে পাননি। তার ভাষায়, ‘স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনি এত বড় একজন মহানায়ক। কিন্তু সেই ধরনের উপস্থাপন গ্যালারিতে পাইনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে একটি ছোট ছবি দেখলাম, কিন্তু তার ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৬৬ বা ১৯৬৯-এর আন্দোলনে তার নেতৃত্বের কোনো ছবি পেলাম না।’ তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের কর্নারে তেমন কিছু পাইনি। লাইব্রেরিতেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই চোখে পড়েনি। মনে হয়েছে, স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস ধীরে ধীরে মুছে ফেলার একটা প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।’
মিরপুর থেকে আসা শাহনাজ পারভিন মিলা বলেন, জাতীয় জাদুঘরে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন তার ভালো লেগেছে। তবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আগের মতো দৃশ্যমান আলাদা উপস্থাপনা তিনি দেখেননি। নওগাঁ থেকে আসা খাজামাত উদ্দিনও একই পর্যবেক্ষণের কথা জানান।
দর্শনার্থীদের এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান আসমা ফেরদৌসী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার সরানো হয়েছে–এটা সত্য। তবে কোনো নিদর্শন ধ্বংস করার অধিকার জাদুঘরের কারো নেই। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেগুলো সংরক্ষণ করা।’ তিনি বলেন, ‘গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জাদুঘরে হামলা বা ভাঙচুরের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় কিছু প্রতিকৃতি ও নিদর্শন সাময়িকভাবে সরিয়ে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আজ যেটা গুরুত্বহীন মনে হতে পারে, ভবিষ্যতে সেটাই আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাদুঘরে কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন নষ্ট করার সুযোগ নেই।’
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবও। তিনি বলেন, ইতিহাসকে একপক্ষীয়ভাবে নয়, ধারাবাহিক ও গবেষণাভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। মহাপরিচালক খবরের কাগজকে বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে যে ভূমিকা রেখেছেন, ইতিহাসে সেই ভূমিকাকে যথাযথ স্থান দেওয়া হবে। আবার ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশেও যা ঘটেছে, সেটাও তুলে ধরা জরুরি। ইতিহাস পর্যালোচনায় ৭১, ৫২ ও ২৪– সব ইতিহাসই প্রাধান্য পাবে। আমরা চাই কোনো অংশ যেন বাদ না পড়ে।’
তানজিম ওয়াহাব আরো জানান, জাতীয় জাদুঘরের ১৭ সদস্যের পরিচালনা বোর্ডের অধীনে একটি ছোট কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে গবেষণা এবং উপস্থাপনার জন্য এই কমিটিতে গবেষক, তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা কাজ করবেন। তারা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসকে নতুনভাবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা করছেন।
জাদুঘরের নতুন উপস্থাপনায় বাংলাদেশের ইতিহাসকে ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনার কথাও জানান মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেক ঐতিহাসিক দলিল ও স্মারক আছে। কিন্তু শুধু স্মারক নয়, গল্পটা কীভাবে বলা হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরতে চাই। শুধু ক্যাপশন নয়, ভিডিওভিত্তিক উপস্থাপনা, অডিও গাইড ও ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইতিহাসকে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ এখন মানুষ শুধু দেয়ালে ঝোলানো ছবি দেখতে চায় না। তারা ইতিহাসকে অনুভব করতে চায়।’
জাতীয় জাদুঘরকে শিশু ও প্রযুক্তিবান্ধব করার উদ্যোগের কথাও জানান তানজিম ওয়াহাব। প্রতি সপ্তাহে স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ দিবস, শিশুবান্ধব গাইডেড ট্যুর ও ডিজিটাল কনটেন্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নেতৃত্বে জাদুঘর পরিদর্শন করবে এবং তাদের জন্য থাকবে বিশেষ শিশুবান্ধব গাইডেড ট্যুর। এতে শুধু শিশুরাই উপকৃত হবে না, শিক্ষকরাও ইতিহাসকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।
জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিকিট কেটে দর্শনার্থী এসেছে ৩১ হাজার ৪১১ জন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দর্শনার্থী কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন জাদুঘরের কর্মচারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর থেকে দর্শক কিছুটা কমেছে। আগে অনেক বেশি মানুষ আসত।’ তিনি আরও জানান, আগে বিভিন্ন টিম মাঠপর্যায়ে গিয়ে নিদর্শন সংগ্রহ করত। এখন সেই কার্যক্রম আগের মতো সক্রিয় নয়।
জাতীয় জাদুঘরের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি জায়গার অভাব। ৯৩ হাজারের বেশি সংগ্রহ থাকলেও প্রদর্শনের সুযোগ খুব সীমিত। এ বিষয়ে মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব জানান, বর্তমান ভবনের সংস্কারের পাশাপাশি ১০ তলাবিশিষ্ট নতুন অ্যানেক্স ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেখানে নতুন গ্যালারি, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশেষায়িত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহের বড় অংশ স্টোরে পড়ে আছে। নতুন ভবন হলে আরও বড় পরিসরে ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা সম্ভব হবে।’
এদিকে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে পৃথক ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক বলেন, ‘আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই জাদুঘরটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে। জুলাই আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় জাদুঘরেও জুলাই কর্নার রাখা হবে। আমরা ধারাবাহিকভাবে সব ইতিহাস উপস্থাপন করতে চাই।’
এদিকে আজ আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে সকাল ১০টায় বর্ণাঢ্য র্যালি, বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং জাদুঘর পর্ষদের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন।