আবারও আলোচনায় তনু হত্যা মামলা, তদন্তে নতুন মোড়!
ছবি: সংগৃহীত
১০:২৭ এএম | ২২ মে, ২০২৬
১০ বছর পর আবারও আলোচনায় এসেছে কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্তে নতুন গতি এসেছে। তনুর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা চার পুরুষের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান, সৈনিক শাহিন আলম ও জাহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসে টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। পরদিন তার বাবা অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
সেনানিবাসের ভেতরে এমন ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলেও দীর্ঘদিনেও হত্যার রহস্যের কোনো কূলকিনারা হয়নি। এমনকি দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণও নির্ধারণ করা যায়নি বলে জানানো হয়। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে ডিবি ও সিআইডি তদন্ত করলেও ২০২০ সাল থেকে মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই।
এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ডিএনএ রিপোর্ট। তনুর পোশাক থেকে নেয়া নমুনা পরীক্ষায় চারজন পুরুষের ডিএনএর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কাজ শুরু হয়। তদন্তে সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান, সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান, সৈনিক শাহিন আলম ও জাহিদুল ইসলামকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে অভিযান শুরু করে পিবিআই।
কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. কাইমুল হক রিংকু বলেন, চারজন পুরুষের সম্পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। সন্দেহভাজনদের মধ্যে জাহিদুজ্জামান ও শাহিন আলমকে খুঁজছে পুলিশ।
গত ২১ এপ্রিল মামলায় প্রথম বড় অগ্রগতি আসে। জড়িত থাকার সন্দেহে কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে।
জানা গেছে, তনুর সঙ্গে হাফিজুরের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন কনসার্টে তিনিই তনুকে নিয়ে যেতেন। তবে হাফিজুরের আয়োজিত সর্বশেষ কনসার্টে তনু উপস্থিত ছিলেন না। সেই ক্ষোভ থেকে তিনি এ ঘটনায় জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পিবিআই।
মো. কাইমুল হক রিংকু বলেন, রিমান্ডে হাফিজুর বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখছে পিবিআই। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই বাকি জড়িতদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এদিকে তনুর পোশাক থেকে পাওয়া নমুনার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া হাফিজুর রহমানের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য তাকে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে নিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের আশা, এই প্রতিবেদন হাতে পেলে মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।
এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনার দাবি তনুর বাবার। তিনি বলেন, যারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদের বিচার করবে। অন্যায় কেউ করে পার পাবে না। একদিন সবাই ধরা পড়বে। আমি অপরাধীদের ফাঁসি চাই।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ১০ বছর পর হলেও এবার তনু হত্যার বিচার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির পেশাগত বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই থাকুক না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যে অপরাধ করেছে, তাকে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তনু হত্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে প্রভাবশালী কেউই এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না। একইসঙ্গে আবারও প্রমাণ হবে, অপরাধ করে শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া যায় না।
কুমিল্লার আলোচিত কলেজছাত্রী তনু হত্যা মামলায় ১০ বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই হত্যাকাণ্ড। ভুক্তভোগী পরিবারের আশা, এবার হয়তো মামলাটি আলোর মুখ দেখবে। তবে শেষ পর্যন্ত বিচার কতটা এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কেএন/এসএন