ঈদের পর মাসব্যাপী মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচিতে ফিরছে বিএনপি
ছবি: সংগৃহীত
০৬:৪৭ এএম | ২৬ মে, ২০২৬
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা রুখে দিতে মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর মাধ্যমে রাজনীতিকে আবার মাঠমুখী করার পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূলকে আরো সক্রিয় করার কথা ভাবছে সরকারে থাকা দলটি। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিএনপির পাশাপাশি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও সমানভাবে মাঠে ভূমিকা পালন করবে বলে জানা গেছে।
বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতা দেশের একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আসন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ইতিবাচক কার্যক্রম সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে। এ লক্ষ্যে দলের তিন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন- ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ইতোমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে বিএনপির পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং গতকাল সোমবার থেকে সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় ঈদের পরেই পূর্ণমাত্রায় কর্মসূচি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত ৯ মে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই রুদ্ধদ্বার মতবিনিময়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে দলের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল প্রশাসনিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া সেখানে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ কিংবা ইশতেহার বাস্তবায়নের তথ্য জানাতে লিফলেট বিতরণ, পথসভা, উঠান বৈঠকের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইউনিটগুলোর নিজেদের সুবিধামতো কর্মসূচি নিতে বলেন। এসব ইস্যুতে প্রতিটি এলাকার দলীয় সংসদ সদস্যকে (এমপি) তৃণমূল তথা থানা-উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি নির্ধারণের নির্দেশ দেন। আলোচনাসাপেক্ষে কর্মসূচি নির্ধারণ করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে জানানোর জন্যও বলা হয়।
এদিকে একই ইস্যুতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত চিঠি দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরের দায়িত্বশীল নেতাদের দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বিএনপি ও দলীয় গঠনতন্ত্রে স্বীকৃত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের (জেলা ও মহানগর পর্যায়ের) নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে কর্মসূচি প্রণয়নের কথা বলা হয়।
বিএনপির একাধিক নেতা দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘জুলাই সনদ’ ও ‘গণভোট’ ইস্যুতে বিরোধী দল ও সরকারি দল বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দলীয় জোট বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে ‘বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কার চায় না’। তবে বিএনপি বরাবরই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, তারা স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে।
এ ছাড়া নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গত তিন মাসে সরকারের নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ জনগণের সামনে তুলে ধরতে এই গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।
কর্মসূচির মধ্যে থাকবে উঠান বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভা, মিছিল এবং সরাসরি গণসংযোগ। জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়নসহ সবপর্যায়ের নেতাকর্মীদের এসব কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব জেলা ও মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।
এদিকে লিফলেট পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজধানীর সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাকিব শিকদার দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, লিফলেটে দেখানো হয়েছে গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘খ’ নম্বর প্রশ্নটি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং তা ‘প্রতারণামূলক’। একই সঙ্গে বিএনপি জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত সনদ বিএনপি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মানতে বদ্ধপরিকর। এ ছাড়া লিফলেটে সংসদে নারী প্রতিনিধি বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনসহ যেসব বিষয় ইতোমধ্যে বিরোধী দল লঙ্ঘন করেছে, তা-ও তুলে ধরা হয়েছে।
রাকিব আরো বলেন, জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী যে সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা বলা আছে। এছাড়া গণভোটের ‘ঘ’ প্রশ্নে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে; সেটিও অক্ষরে অক্ষরে মানতে অঙ্গীকারবদ্ধ বিএনপি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে অনেক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের কাছে বিষয়গুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ছাত্রদলের আহ্বায়ক আসিফ হোসেন রচি বলেন, কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে আমরা লিফলেট পেলেও এখনো কোনো গাইডলাইন পাইনি। যেহেতু ঈদ খুবই কাছে, ক্যাম্পাসও ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এই কারণে ওইভাবে এখনো কর্মসূচি শুরু হয়নি। তবে ঈদের পরে ক্যাম্পাস খুললে এই কর্মসূচিতে মাঠে নামব আমরা।
তবে এই কর্মসূচি কেবল এক মাসের জন্যই চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি এ এ জহির উদ্দিন তুহিন। বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনÑ বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও যুবদল এতে সম্পৃক্ত হবে বলে জানান তিনি। বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো নিজ নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী আলাদা কর্মসূচি নিতে পারবে। ঈদের পর থেকে পুরো উদ্যমে কর্মসূচি শুরু হতে পারে।
তবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ইতোমধ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিটি আসনে ওয়ার্ড পর্যায়ে এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপিরাও এতে অংশ নিচ্ছেন।
এদিকে মাঠের এই কর্মসূচিকে বিএনপি সিরিয়াসভাবে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ। তিনি বলেন, প্রত্যেক ইউনিটকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইউনিটগুলো ইতোমধ্যে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কারণ, বিএনপি জুলাই সনদের বিরুদ্ধে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না- এমন একটি ‘অপপ্রচার’ মাঠে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতেই বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, পাশাপাশি দলীয় জেলা ও মহানগর কমিটিগুলোর মাধ্যমে এলাকায় এলাকায় পাল্টা বক্তব্য তুলে ধরার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এ ব্যাপারে দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা আগামী এক মাসব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এর মাধ্যমে নেতাকর্মীদের আবার সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে এবং রাজনীতিকে আবার মাঠমুখী করার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্য দিয়েই সাংগঠনিক তৎপরতা আরো বাড়বে এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজও শিগগিরই শুরু হবে।
প্রিন্স আরো বলেন, আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে— নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া। জুলাই সনদ নিয়ে জামায়াত-এনসিপি জোট যে প্রচারণা চালাচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের বক্তব্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার এ পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলাসহ জনজীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে- এসব বিষয় জনগণকে জানানো হবে। এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই আমাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা নতুনভাবে শুরু হবে।
এসকে/টিএ